ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়, শিক্ষাক্ষেত্রের নানা সংকট এবং সরকারি বিভিন্ন বিতর্কিত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র গণ-অসন্তোষ শুরু হয়েছে।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ফ্রান্সে চলমান এই গণ-আন্দোলনের আঁচ এবার গিয়ে লেগেছে প্রতিবেশী দেশ জার্মানিতেও। শনিবার দেশ দুটির রাজপথে লাখো মানুষের ঢল নামে। জার্মানিতে মূলত তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে প্রায় এক লাখ বিশ হাজার মানুষ এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেন, অন্যদিকে ফ্রান্সেও একই দিনে কয়েক লাখ বিক্ষোভকারী রাস্তায় নেমে আসেন।
জার্মানিতে এই গণজমায়েতটি ‘জেন জেড হ্যাজ গট দিস!’ নামক একটি নতুন প্রজন্মের সংগঠনের ব্যানারে অনুষ্ঠিত হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি, স্কুল-কলেজগুলোতে অপর্যাপ্ত সরকারি বরাদ্দ, পরিবেশগত নানা শঙ্কা এবং পুনরায় বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ চালুর গুঞ্জনের প্রতিবাদেই মূলত তারা এই কর্মসূচির ডাক দেয়। বার্লিন, ফ্রাঙ্কফুর্ট, কোলন এবং মিউনিখের মতো প্রধান শহরগুলোতে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। হ্যালোইন উৎসবের দিনটিকে বেছে নেওয়ার মূল কারণ ছিল যাতে আরও বেশি সংখ্যক মানুষ এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে। বার্লিনের পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকলেও কোলন ও হামবুর্গে বিক্ষোভকারীরা আগ্রাসী হয়ে ওঠেন। কোলনে আতশবাজি ফোটানোর জেরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জলকামান ছুড়তে বাধ্য হয়। এছাড়া হামবুর্গে ব্যারিকেড জ্বালিয়ে দেওয়া ও জরুরি সেবাকর্মীদের ওপর চড়াও হওয়ার ঘটনায় দাঙ্গা পুলিশ নামানো হয়। ফ্রাঙ্কফুর্টে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়; সেখানে সেবাকর্মীদের ওপর পেট্রলবোমা নিক্ষেপ এবং বেশ কিছু দোকানের কাঁচ ভাঙচুর করা হয়। এর ফলে জেইল শপিং এলাকার একটি অংশ পুলিশ বন্ধ করে দেয়। সেখানে একটি অস্ত্রের দোকানের কাঁচ ভাঙার অভিযোগে একজনকে আটক করার পাশাপাশি দুটি অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে।
এদিকে ফ্রান্সেও শনিবার ‘ইয়েলো ভেস্ট’ মুভমেন্টের অধীনে তৃতীয় পর্যায়ের দেশব্যাপী প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছে, যা গত ১৭ ও ২৪ অক্টোবরের ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠিত হলো। ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, শনিবারের এই আয়োজনে রাজধানী প্যারিসের ৭০ হাজারসহ পুরো দেশজুড়ে প্রায় তিন লাখ বিশ হাজার মানুষ অংশ নেন। উল্লেখ্য, আগের দুটি কর্মসূচিতে যথাক্রমে সাড়ে পাঁচ লাখ এবং চার লাখ দশ হাজার মানুষের সমাগম হয়েছিল। যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে দেশজুড়ে অতিরিক্ত ৭০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন রাখা হয় এবং শনিবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত ২৯৬ জনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ মূলত শহরের মূল কেন্দ্রগুলোর বাইরে এই জমায়েতের অনুমতি দিয়েছিলেন। বেশিরভাগ স্থানে আন্দোলনকারীরা শান্তিপূর্ণ অবস্থানে থাকলেও বোর্দো, তুলুজ, রেন, লিল, নঁত, মার্সেই এবং লিয়োঁর মতো বেশ কয়েকটি শহরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে রেন শহরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা ও অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া গেছে। মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এই টানা বিক্ষোভে এক হাজার একশ তিরানব্বই জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
ফ্রান্সে এই অস্থিরতার সূত্রপাত মূলত গত সেপ্টেম্বরের শেষাংশে। জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তীব্র শিক্ষক সংকট, শিক্ষা উপকরণের ঘাটতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের দাবিতে স্কুলশিক্ষার্থীরা প্রথমে রাস্তায় নামে। পরবর্তীতে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন এবং অন্যান্য পেশাজীবীরাও এই ছাত্রবিক্ষোভের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। গত ১৭ অক্টোবরের বিশাল গণজমায়েতে দেশজুড়ে সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন, যেখানে তিন হাজারের বেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটতরাজ চালানো হয় এবং সাতাশশোর বেশি আন্দোলনকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। চলমান এই সংকটময় পরিস্থিতিকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ একটি ‘সম্মিলিত ব্যর্থতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সংবাদমাধ্যম সিএনএনের সূত্রমতে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আগামী ৫ নভেম্বর দেশব্যাপী ধর্মঘট ও নতুন করে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের একটি জোট, যার ফলে দেশটিতে এই আন্দোলনের পরিধি সামনে আরও ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র : সিএনএন