ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় অবরুদ্ধ হওয়ার তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ার আগেই গত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ১১ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত খনিজ তেল তড়িঘড়ি করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে ইরান। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ব্লুমবার্গের জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি বিশাল সুপারট্যাঙ্কার এবং একটি সুয়েজম্যাক্স কার্গো জাহাজে করে এই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি দেশটির বিভিন্ন বন্দর থেকে সাগরে রওনা দিয়েছে। যার মধ্যে চারটি জাহাজ ওমান উপসাগরে অবস্থান করছে এবং অপর একটি জাহাজ হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার বার্তা পাঠিয়েছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ বেসামরিক অবকাঠামো ও রেল যোগাযোগ লক্ষ্য করে মার্কিন বাহিনী টানা দ্বিতীয় দিনের মতো বিমান হামলা চালানোর পরপরই তেহরান এই প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ইরানি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপত্র হোসেইন কেরমানপুর জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক এই সামরিক আগ্রাসনে ১৪ জন নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৭৮ জন, যাদের মধ্যে ৪৭ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ফলে দুই দেশের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ পুরোপুরি ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, যা হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলকে সম্পূর্ণ স্থবির করে দিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতির খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। চলতি সপ্তাহে বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য প্রায় নয় শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে বৃহস্পতিবার প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিক্রি হয়েছে প্রায় ৭৯ ডলারে।
অবশ্য তেহরানের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে সরিয়ে নেওয়া এই ১১ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের কোনো নির্দিষ্ট ক্রেতা বা গন্তব্য আগে থেকে ঠিক করা আছে কি না, তা এখনও স্পষ্টভাবে জানা যায়নি। এর আগে কাতার ও সৌদি আরবের বেশ কিছু বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানি বাহিনীর হামলার অভিযোগ এনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের ওপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের একটি বিশেষ ছাড়পত্র বাতিল করে। এর ফলে গত মঙ্গলবার থেকেই বিশ্ববাজারে লাখ লাখ ব্যারেল ইরানি তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। মার্কিন এই পদক্ষেপের কড়া জবাব দিয়ে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নৌ শাখা সতর্কবার্তা জারি করেছে যে, হরমুজ প্রণালিতে ওয়াশিংটনের সামরিক উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে এবং পরবর্তীতে যেকোনো ধরনের উসকানির কঠোর ও দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে। অতীতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ঘিরে দুই দেশের বিরোধ মূল আলোচনায় থাকলেও, বর্তমানে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার প্রধান সংঘাতের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।