জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ভোটকেন্দ্রভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম জানিয়েছেন, সারা দেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে প্রায় ৮ হাজার ৭৭০টিকে ঝুঁকিপূর্ণ এবং আরও ১৬ হাজার কেন্দ্রকে মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের মিডিয়া সেন্টারে ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন। আইজিপি জানান, চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ ও মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবে।
বাহারুল আলম বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে নিরাপদ নির্বাচন হিসেবে আয়োজন করতে সরকার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে। এ লক্ষ্যে সারা দেশে প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন পুলিশ সদস্য, প্রায় ৬ লাখ আনসার সদস্য, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং প্রায় ১ লাখ সেনাবাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।
নির্বাচনী নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিস্তারিত তুলে ধরে আইজিপি জানান, তিন স্তরের নিরাপত্তা কাঠামো বাস্তবায়ন করা হয়েছে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে থাকবে স্ট্যাটিক ফোর্স, কেন্দ্রের বাইরে মোবাইল টিম নিয়মিত টহল দেবে এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকবে স্ট্রাইকিং ফোর্স।
তিনি আরও বলেন, এবারের নির্বাচনে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে পুলিশের পক্ষ থেকে বডি ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। প্রয়োজনে জেলা পুলিশ সুপাররা ড্রোন ক্যামেরার সহায়তাও নেবেন।
অস্ত্র উদ্ধার ও নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, লুট হওয়া ও অবৈধ অস্ত্র নির্বাচনকালীন বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত। লাইসেন্সধারী ব্যক্তিগত অস্ত্রের মধ্যে এক হাজারের বেশি অস্ত্র লুট হয়েছিল, যার মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৩৩০টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি বলেন, যেকোনো অবৈধ অস্ত্রই বড় ঝুঁকি, এ কারণেই সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
সহিংসতার চিত্র তুলে ধরে আইজিপি জানান, ১১ ডিসেম্বর থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে মোট ৩১৭টি সহিংস ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ৬০৩ জন এবং নিহত হয়েছেন ৫ জন।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “একটি মৃত্যুও আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। আমরা চেষ্টা করেছি যেন একটি মৃত্যুও না ঘটে। তবে বাস্তবতায় কিছু ঘটনা ঘটেছে, যেগুলোর তদন্ত চলছে।”
সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত ৩ হাজার অপরাধী ও ৩৫২ জন শুটারের তালিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে আইজিপি বলেন, তালিকাটি কার তৈরি সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তবে তার মতে, ১৮ কোটি মানুষের দেশে এ সংখ্যক অপরাধী নির্বাচন বানচাল করতে পারবে—এমন আশঙ্কার কারণ নেই।
সাংবাদিকদের সঙ্গে পুলিশের আচরণ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে বাহারুল আলম স্বীকার করেন, কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময়ের ফ্যাসিস্ট শাসনের ফলে পুলিশের মধ্যে যে মানসিকতা তৈরি হয়েছিল, তা এক বছরে পুরোপুরি পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সেই পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে।
তিনি জানান, ইউনেস্কো ও ইউএনওডিসির সহায়তায় সাংবাদিকদের সঙ্গে পেশাদার আচরণ বিষয়ে পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
৫ আগস্টে জেল থেকে পালানো আসামি এবং জঙ্গি হুমকি প্রসঙ্গে আইজিপি বলেন, প্রচারকালীন সময়ে কিছু আশঙ্কা থাকলেও বড় কোনো ঘটনা ঘটেনি। বর্তমানে নির্বাচন ব্যাহত করার মতো শক্তিশালী কোনো জঙ্গি হুমকি নেই।
নিজের প্রত্যাশার কথা জানিয়ে আইজিপি বলেন, “আমরা ইতিহাসে একটি উদাহরণ তৈরি করতে চাই যাতে এই নির্বাচন হয় শান্তিপূর্ণ, উৎসবমুখর ও গ্রহণযোগ্য হয়। কতটা সফল হলাম, তার মূল্যায়ন করবে দেশবাসী।”