বুধবার, 28 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

কিংবদন্তি মরমি সাধক রাধারমণ দত্তের সমাধিস্থলে গানবাজনা বন্ধের আবেদন

সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে বাউলগানের আসর নিয়ে আপত্তির পর এবার পাশের জগন্নাথপুর উপজেলায় ধামাইল গানের প্রবর্তক বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্তের গ্রামেও গানবাজনা বন্ধের দাবি উঠেছে। এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন কেশবপুর গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা।

কিংবদন্তি মরমি সাধক রাধারমণ দত্তের সমাধিস্থলে গানবাজনা বন্ধের আবেদন

সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে বাউলগানের আসর নিয়ে আপত্তির পর এবার পাশের জগন্নাথপুর উপজেলায় ধামাইল গানের প্রবর্তক বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্তের গ্রামেও গানবাজনা বন্ধের দাবি উঠেছে। এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন কেশবপুর গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা।

গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামের ‘কেশবপুর ইসলামিক অর্গানাইজেশন’ কমিটির পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর আবেদনটি জমা দেওয়া হয়।

আবেদনে বলা হয়েছে, কেশবপুর বাজারসংলগ্ন কবরস্থান এলাকায় মরমি সাধক রাধারমণ দত্তকে স্মরণ করে গানবাজনা ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আবেদনকারীদের দাবি, তাঁদের ভাষায়, এসব অনৈসলামিক কার্যক্রমের কারণে এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে জনস্বার্থ এবং কবরস্থানের পবিত্রতা রক্ষার যুক্তি দেখিয়ে তাঁরা ওই আয়োজন বন্ধের অনুরোধ জানিয়েছেন।

আবেদনপত্রে কাদির মিয়া, রফিক মিয়া, মো. তৈমুর আলীসহ স্থানীয় বেশ কয়েকজন বাসিন্দা স্বাক্ষর করেছেন।

রাধারমণের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাম

জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামেই ধামাইল সংগীত ও ধামাইল নৃত্যের প্রবর্তক বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্তের সমাধিস্থল রয়েছে। তাঁর লেখা গান এবং সৃষ্টিকর্ম বাংলা লোকসংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় সাংস্কৃতিক চর্চা চলে আসছে। স্থানীয় প্রশাসন ও বাসিন্দাদের যৌথ উদ্যোগে প্রতিবছর সেখানে ‘রাধারমণ উৎসব’ আয়োজন করা হয়।

রাধারমণ দত্তের গ্রামে গানবাজনা বন্ধের আবেদনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি ও সুনামগঞ্জের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, ‘লোকসংস্কৃতি আমাদের শিকড়। সংস্কৃতির বৈচিত্র্যই বাংলাদেশের সৌন্দর্য। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেশের সংস্কৃতিচর্চাকে সংকুচিত করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘হাসন রাজা, রাধারমণ দত্ত, দুর্বীন শাহ, শাহ আবদুল করিমসহ অসংখ্য গুণী সাধক সুনামগঞ্জের রত্ন। তারা সুনামগঞ্জের সুনাম বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছেন। রাধারমণের জন্মভিটায় এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আশা করি, প্রশাসন অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’

প্রশাসনের বক্তব্য

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জগন্নাথপুরের ইউএনও মো. ইসলাম উদ্দিনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে ফোন ধরেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মহসীন উদ্দীন। ইউএনও সিলেটে রয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়টি আমি শুনেছি। গত বছর উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে রাধারমণ দত্তকে স্মরণ করে অনুষ্ঠান হয়েছিল। আগামী ১ তারিখে একটি প্রস্তুতিমূলক সভা আছে। সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মতিউর রহমান খান বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়ে আমি কিছু জানি না। তবে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এ বছরও রাধারমণ দত্তের প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। এর প্রস্তুতি ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।’

দিরাইয়েও সাংস্কৃতিক আয়োজনে আপত্তি

এর আগে গত ২২ অক্টোবর দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের হাতিয়া গ্রামে বাউলগানের একটি আসর বন্ধের আবেদন করা হয়েছিল পুলিশের কাছে। আয়োজনে ‘অশ্লীলতা’ রয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে আপত্তি জানানো হয়। তবে বিরোধিতা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়।

যুক্তরাজ্যপ্রবাসী শওকত আলী তাঁর মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে ওই গানের আসরের আয়োজন করেছিলেন। হাতিয়া গ্রামের পাশের তাড়ল ইউনিয়নের উজানধল গ্রামেই প্রয়াত বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের বাড়ি অবস্থিত।

এ ছাড়া দিরাই উপজেলা সদরের স্টেডিয়ামে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচও বাধার মুখে বাতিল হয়ে যায়। ‘দিরাইয়ে ইসলামবিরোধী কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটি’র আপত্তির কারণে ম্যাচটি আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। গত ৫ অক্টোবর স্থানীয় স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাব ও সিলেটের জারা স্পোর্টিং ক্লাবের মধ্যে খেলাটি হওয়ার কথা ছিল। ঘটনাটি নিয়ে তখন ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়।

সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক সাংস্কৃতিক আয়োজন নিয়ে আপত্তি ও নিষেধাজ্ঞার দাবি ওঠায় লোকসংস্কৃতি চর্চার পরিসর নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।