শুক্রবার, 6 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

নেপালে জলবিদ্যুৎ টানেলে ‘শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে’ ২ জন জীবিত উদ্ধার

উদ্ধার হওয়া দুজন হলেন নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের (এনইএ) মেকানিক্যাল ফোরম্যান সঞ্জয়া সাহ এবং কবির মহার্জন। এনইএর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সুরেশ রাউত জানিয়েছেন, টানেল থেকে বের করার পর সঞ্জয়া সাহকে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে কবির মহার্জনকে হেলিকপ্টারে করে কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

নেপালে জলবিদ্যুৎ টানেলে ‘শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে’ ২ জন জীবিত উদ্ধার

নয় দিন ধরে কাদামাটি ও পাথরের নিচে আটকে থাকার পর নেপালের একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেল থেকে দুই কর্মীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) ভোররাতে দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ এই উদ্ধার অভিযান সফল হয়। তবে রসূয়া জেলার ত্রিশূলি-থ্রিএ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আরও শ্রমিক আটকে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের উদ্ধারে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।

উদ্ধার হওয়া দুজন হলেন নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের (এনইএ) মেকানিক্যাল ফোরম্যান সঞ্জয়া সাহ এবং কবির মহার্জন। এনইএর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সুরেশ রাউত জানিয়েছেন, টানেল থেকে বের করার পর সঞ্জয়া সাহকে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে কবির মহার্জনকে হেলিকপ্টারে করে কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

কবিরকে জীবিত উদ্ধারের খবর পেয়ে স্বস্তি ফিরেছে তার পরিবারে। তার স্ত্রী হিরাশোভা মহার্জন বিবিসি নেপালিকে বলেন, ‘আমি ফেসবুকে ছবিগুলো দেখেছি। আমি খুব খুশি হয়েছি। তাকে কাঠমান্ডুর সেনাবাহিনীর হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। আমি হাসপাতালের দিকে যাচ্ছি।’

প্রথমে খুঁজে বের করতে হয়েছে টানেলের মুখ

উদ্ধারকারীদের জন্য অভিযানটি শুরুই হয়েছিল অস্বাভাবিক এক সমস্যার মধ্য দিয়ে। বন্যা ও ভূমিধসে পুরো এলাকার চেহারা বদলে যাওয়ায় যে টানেলের মুখ আগে পাহাড়ের ওপর দেখা যেত, সেটিই এখন মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। ফলে পুরোনো অবস্থানের সঙ্গে মিলিয়ে প্রবেশপথ শনাক্ত করার সুযোগ ছিল না।

উদ্ধার অভিযানে থাকা ডিক্স বলেন, ‘এর আগে এমন কোনো উদ্ধার অভিযান দেখিনি, যেখানে একটি টানেলের প্রবেশপথ খুঁজে বের করতে হয়েছে, যেটি আগে পাহাড়ের ওপর ছিল, কিন্তু এখন মাটির নিচে। আপনারা কল্পনা করতে পারেন, ভূমিধসের ব্যাপ্তি কতটা ভয়াবহ ছিল। এটি টানেলের প্রবেশপথ পুরোপুরি চাপা দিয়ে ফেলেছিল।’

টানেলের সম্ভাব্য অবস্থান বের করতে উদ্ধারকারী দলকে একাধিক উৎসের তথ্য মিলিয়ে দেখতে হয়। তারা পুরোনো টপোগ্রাফিক মানচিত্র, বন্যার পর তোলা স্যাটেলাইট ছবি, হেলিকপ্টার থেকে ধারণ করা ভিডিও এবং বিভিন্ন প্রকৌশলগত পদ্ধতি ব্যবহার করেন। পাহাড়ের ওপর পাওয়া বিদ্যুতের খুঁটিও তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে। এসব তথ্য বিশ্লেষণের পর সম্ভাব্য জায়গা চিহ্নিত করে সেখানে খনন শুরু করা হয়।

টানেলের ভেতর পথ তৈরিতে বিস্ফোরক

টানেলের প্রবেশপথ পাওয়া গেলেও তখনো জানা যায়নি আটকে থাকা কর্মীরা ঠিক কোন জায়গায় রয়েছেন। ফলে এবার তাদের অবস্থান শনাক্ত করার পালা। উদ্ধারকারীরা একদিকে খনন চালাতে থাকেন, অন্যদিকে ভেতর থেকে কোনো শব্দ পাওয়া যায় কি না, সেদিকেও নজর রাখেন।

ডিক্স বলেন, ‘আমরা জানতাম তারা সামনে কোথাও আছে, কিন্তু ঠিক কোথায়, তা জানতাম না। তাই সঠিক দিকে খনন শুরু করতে হয়। আর সম্ভব হলে ভেতর থেকে কারও আওয়াজ শোনা যায় কি না, সেটাও শুনতে হয়।’

এরই মধ্যে আরেকটি বড় বাধা সামনে আসে। টানেলের ভেতরে জমে থাকা কাদা ও পাথরের স্তর এত শক্ত ছিল যে সেগুলো সরাতে বিস্ফোরক ব্যবহার করতে হয়। এমনকি কিছু পাথরের আকার ছিল গাড়ির চেয়েও বড়।

সাধারণ পরিস্থিতিতে এভাবে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পথ তৈরি করেন না উদ্ধারকারীরা। কারণ এতে টানেলের ভেতরে আটকে থাকা মানুষ এবং উদ্ধারকারীদের জন্যও প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে নেপালের সেনাবাহিনী অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজটি করায় তাদের প্রশংসা করেছেন ডিক্স। তিনি জানান, এমনভাবে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে, যাতে টানেলের কাঠামো দুর্বল বা অস্থিতিশীল হয়ে না পড়ে।

পানি সরিয়ে তৈরি হয় সরু পথ

খননকাজ কিছুটা এগোতেই দেখা যায়, টানেলের ভেতরে এখনো পানি জমে রয়েছে। সেই পানি বের করতে খননযন্ত্র ও পাম্প ব্যবহার করা হয়। পরে টানেল থেকে বাইরের নদী পর্যন্ত একের পর এক নালা তৈরি করা হয়, যাতে জমে থাকা পানি বাইরে চলে যেতে পারে।

এরপর মূল টানেলের ওপর জমে থাকা ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে একজন মানুষ চলাচল করতে পারেন—এমন একটি ‘খুব ছোট টানেল’ তৈরি করেন উদ্ধারকারীরা।

এই ব্যবস্থার একটি সুবিধার কথাও তুলে ধরেছেন ডিক্স। তিনি বলেন, ‘এই জায়গাটির সুবিধা হলো, মূল টানেলের ছাদটিকেই ছোট টানেলটির ছাদ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। একই সঙ্গে এতে বন্যার পানির ঝুঁকিও কমে।’

শুক্রবার ভোররাতে অবশেষে উদ্ধারকারীরা টানেলের ভেতর থেকে মানুষের কণ্ঠস্বরের মতো শব্দ শুনতে পান। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তারা ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলেন, ‘চিন্তা করবেন না, আমরা আপনাদের উদ্ধার করতে এখানে এসেছি।’

ভেতর থেকে তখন ক্ষীণ স্বরে জবাব আসে, ‘ঠিক আছে’। এরপর আর বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি। সঞ্জয়া শাহ ও কবির মহার্জনকে জীবিত অবস্থায় বাইরে নিয়ে আসেন উদ্ধারকারীরা।

এখনো চলছে উদ্ধার অভিযান

দুইজনকে জীবিত পাওয়ার পরও ত্রিশূলি-থ্রিএ প্রকল্পে উদ্ধারকাজ শেষ হয়নি। সুরেশ রাউতের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, টানেলের ভেতরে মোট ৩৯ জন শ্রমিক ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তাদের মধ্যে কতজন এখনো বেঁচে আছেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

উদ্ধার হওয়া দুজনকে হেলিকপ্টারে করে কাঠমান্ডুর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে টানেলের ভেতরে থাকা অন্যদের উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

নেপালে এখনো ৫ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে কয়েক শ শ্রমিক নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বড় টানেল নেটওয়ার্কে কাজ করতেন। এসব টানেলে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারের অংশ হিসেবে প্রকৌশলীরা ভেতরে বাতাস সরবরাহের ব্যবস্থাও করছেন।

দেশটির আরও প্রায় ছয়টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আলাদা করে উদ্ধার অভিযান চলছে। এসব স্থানে ১৫০ জনের বেশি মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের আশা, ত্রিশূলি-থ্রিএ টানেলে আটকে থাকা আরও অন্তত ৩৯ জনকেও উদ্ধার করা সম্ভব হবে।

‘গোল্ডিলকস জোন’ ঘিরে নতুন আশা

উদ্ধারকারী দল টানেলের মুখ থেকে প্রায় ৬০ মিটার পর্যন্ত খনন করতে পেরেছে। তবে পাহাড়ের আরও গভীরে থাকা জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছাতে তাদের সামনে এখনো প্রায় ১৫০ মিটার পথ বাকি বলে জানিয়েছেন ডিক্স।

তাদের অন্যতম আশা, বন্যার সঙ্গে ভেসে আসা কাদা-পাথরের ধ্বংসস্তূপ জলবিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছায়নি। তা না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত। পাথর ও কাদার আঘাতে ভেতরে থাকা মানুষ আহত হতে পারতেন। এমনকি পুরো কেন্দ্র পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকত।

তবে উদ্ধারকারীদের জন্য বিপদ এখনো কাটেনি। টানেলের সামনে এমন পানি জমে থাকতে পারে, যা ভেতরে কাজ করা মানুষদের ডুবিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে বাইরে নতুন করে বন্যা দেখা দিলে পেছন দিক থেকেও পানি ঢুকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ডিক্স বলেন, ‘এখনো সামনে গিয়ে আমরা এমন পানির মুখোমুখি হতে পারি, যা টানেলের ভেতরে কাজ করা মানুষদের ডুবিয়ে দিতে পারে। আবার বাইরে নতুন করে বন্যা হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। সেক্ষেত্রে পেছন দিক থেকেও পানি আসতে পারে। অর্থাৎ দুই দিক থেকেই পানির মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি আছে।’

তবে দুই কর্মীকে জীবিত উদ্ধারের পর উদ্ধারকারীদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। ডিক্সের ভাষায়, এতক্ষণে তারা বুঝতে পারছেন যে তাদের পরিকল্পনা সঠিক পথে রয়েছে এবং সেটি কাজও করছে।

তিনি বলেন, ‘এটা বড় স্বস্তির বিষয় যে আমরা সঠিক পথেই এগোচ্ছি। আর এতে আমাদের নতুন করে শক্তি এসেছে যে উদ্ধারকাজ কীভাবে পরিচালনা করা হবে, সে বিষয়ে আমাদের পরিকল্পনা কাজ করছে। এর আগে আমরা কখনো এমন কিছু করিনি।’

ডিক্স যে এলাকার দিকে এখন এগোচ্ছেন, সেটির নাম দিয়েছেন ‘গোল্ডিলকস জোন’। তার মতে, ওই জায়গায় মানুষের বেঁচে থাকার মতো পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে অনুকূল।

জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সবচেয়ে ওপরের অংশে ওই জায়গাটি অবস্থিত। সেখানে কিছুটা ফাঁকা জায়গা রয়েছে। উদ্ধারকারীদের ধারণা, সেখানে বেঁচে থাকা শ্রমিকরা আশ্রয় নিয়ে থাকতে পারেন।

ডিক্স পরিস্থিতিকে ক্যাসিনোর সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ‘আমরা দুজনকে বের করে এনেছি। আমরা যদি ক্যাসিনোতে খেলতাম, তাহলে কেউ কেউ বলতে পারতেন, এবার উঠে যাওয়ার সময় হয়েছে। কিন্তু আমরা বলছি, খেলা চলছে, এবার ঘরের (ক্যাসিনোর) বিরুদ্ধে খেলতে হবে।’

জীবিত দুজনের পাশাপাশি মিলল মরদেহ

দুই কর্মীকে উদ্ধারের পর টানেলের ভেতর থেকে তৃতীয় এক ব্যক্তির মরদেহও উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে থাকা নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের উপব্যবস্থাপক সুরেশ রাউত জানিয়েছেন, মরদেহটি এতটাই ফুলে গেছে যে পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘টানেলের ভেতরে যে মরদেহটি পাওয়া গেছে, সেটি ফুলে গেছে এবং শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।’

তার ধারণা, টানেল থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করার সময় বন্যার পানিতে আটকা পড়ে ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।

বন্যায় নেপালে মৃত ১,২৮৭, নিখোঁজ ৫,০৮৩

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার সর্বশেষ হিসাবে, বন্যায় এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২৮৭টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৫ হাজার ৮৩ জন। এর আগে দেশটির পুলিশ জানিয়েছিল, মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ২৮০ এবং নিখোঁজের সংখ্যা ৪ হাজার ৭৯৮।

বন্যার ক্ষয়ক্ষতি সামাল দিতে ত্রিশূলি-থ্রিএ প্রকল্পের পাশাপাশি দেশের অন্য এলাকাতেও উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চলছে। নেপালের সেনাবাহিনীর এক কর্নেল জানিয়েছেন, উপত্যকার সাতটি টানেল এবং আরও ১৯টি এলাকায় সেনা সদস্যদের উদ্ধারকাজে মোতায়েন করা হয়েছে।

ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে জাতিসংঘের উদ্বেগ

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত দুর্গম এলাকাগুলোতে পৌঁছানো নিয়ে নতুন করে সমস্যার কথা জানিয়েছে জাতিসংঘ। সড়ক ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় বিচ্ছিন্ন হিমালয় অঞ্চলের মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় পণ্য বহনে ড্রোন এবং শ্রমিক ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

নেপালে নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী লিলা পিটার্স ইয়াহিয়া বলেন, ‘দুর্যোগের ব্যাপ্তি, ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা—সবকিছুই অবিশ্বাস্য। সেখানে উদ্ধার অভিযান এবং কাদামাটি ও পাথরে বন্ধ হয়ে যাওয়া জায়গাগুলোতে পৌঁছানো অত্যন্ত, অত্যন্ত, অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।’