রবিবার, 8 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

ওমানের মাধ্যমে এশিয়ায় বাড়তি তেল পাঠানোর প্রস্তাব সৌদির

লেনদেনে বৈশ্বিক বাজার আদর্শ ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য প্রতি ব্যারেলে দুই ডলার বিরানব্বই সেন্ট বা দুই দশমিক সাত শতাংশ হ্রাস পেয়ে একওমানের বিকল্প রুটে এশিয়ায় সৌদি জ্বালানি পাঠানোর পরিকল্পনায় বিশ্ববাজারে তেলের দরপতন।

ওমানের মাধ্যমে এশিয়ায় বাড়তি তেল পাঠানোর প্রস্তাব সৌদির
ওমানের সমুদ্রসীমা ব্যবহার করে এশিয়ার দেশগুলোতে অতিরিক্ত অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানির নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি আরব। রিয়াদের এমন সিদ্ধান্তের খবর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়ার পরই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বড় ধরনের বিপর্যয়ে পড়ার যে ভীতি তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই প্রশমিত হয়েছে। একই সাথে মার্কিন বাজারে তেলের মজুদ প্রত্যাশিত হারের চেয়ে কম কমার কারণেও মূল্যের ওপর এই নিম্নমুখী প্রভাব পড়েছে।

বুধবারের লেনদেনে বৈশ্বিক বাজার আদর্শ ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য প্রতি ব্যারেলে দুই ডলার বিরানব্বই সেন্ট বা দুই দশমিক সাত শতাংশ হ্রাস পেয়ে একওমানের বিকল্প রুটে এশিয়ায় সৌদি জ্বালানি পাঠানোর পরিকল্পনায় বিশ্ববাজারে তেলের দরপতন।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে সৌদি আরবের একটি বিকল্প সরবরাহ পরিকল্পনা। ওমানের জলসীমা ব্যবহার করে এশিয়ার বাজারে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে রিয়াদ। এই সিদ্ধান্তের প্রভাবে বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট ঘিরে বৈশ্বিক সরবরাহ দীর্ঘমেয়াদে ভেঙে পড়ার যে ভীতি কাজ করছিল, তাও কিছুটা শিথিল হয়েছে। এর পাশাপাশি মার্কিন বাজারে মজুত কমার ধীরগতিও মূল্যহ্রাসে প্রভাব ফেলেছে।

লেনদেনের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত জ্বালানির দাম ব্যারেলে দুই ডলার বিরানব্বই সেন্ট বা দুই দশমিক সাত শতাংশ হ্রাস পেয়ে একশ পাঁচ ডলার তিরাশি সেন্টে নেমেছে। অন্যদিকে আমেরিকার প্রধান বাজার ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের ক্ষেত্রে দরপতন হয়েছে তিন ডলার চল্লিশ সেন্ট বা তিন দশমিক দুই শতাংশ। ফলে দিনের লেনদেন শেষে পণ্যটির মূল্য দাঁড়ায় ব্যারেলে একশ দুই ডলার তেতাল্লিশ সেন্ট।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে ওমানের সোহার বন্দর সংলগ্ন সামুদ্রিক এলাকায় ভাসমান জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের মাধ্যমে এশিয়ার পরিশোধন কারখানাগুলোতে পাঠানো হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সৌদি আরবের নিজস্ব পাইপলাইনে ক্ষয়ক্ষতির ফলে সৃষ্ট ঘাটতি দ্রুত সামাল দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আর্থিক পরিষেবা প্রতিষ্ঠান ইউবিএসের বিশ্লেষক জিওভান্নি স্তাউনোভোর মতে, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সৌদি সরবরাহ অব্যাহত থাকার খবরে বৈশ্বিক সংকট তাৎক্ষণিকভাবে লাঘব হয়েছে।

এর আগে লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ ইয়ানবু বন্দর থেকে জ্বালানি পাঠানো স্থগিত হওয়া এবং ইউরোপের কিছু চালানের চুক্তি বাতিল হওয়ায় তেলের বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দেয়। পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে ইয়ানবুতে সংযুক্ত পাইপলাইনে আঘাত হানার পর সেখানে মূল্যবৃদ্ধি ঘটে তিন ডলারের বেশি। আমেরিকা ও ইসরায়েলি অভিযানের প্রেক্ষাপটে তেহরান হরমুজ প্রণালিতে কড়াকড়ি আরোপ করার পর সৌদি আরবের জন্য ইয়ানবু বন্দরই প্রধান বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সাধারণ সময়ে বৈশ্বিক চাহিদার প্রায় কুড়ি শতাংশ জ্বালানি ও তরলীকৃত গ্যাস পরিবাহিত হতো হরমুজ দিয়ে, অথচ সাম্প্রতিক নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে সেই প্রণালি দিয়ে জাহাজের চলাচল স্বাভাবিকের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত হয়ে এসেছে।

আমেরিকার জ্বালানি তথ্য সংস্থার সবশেষ হিসাব মতে, সেখানে অপরিশোধিত তেলের মজুত হ্রাস পেয়েছে আনুমানিক ছয় লাখ চল্লিশ হাজার ব্যারেল। বিশেষজ্ঞদের যে পূর্বাভাস ছিল, বাস্তব ঘাটতি তার চেয়ে অনেকটাই কম। উপরন্তু দেশটিতে ডিজেল ও পেট্রোলের মতো প্রক্রিয়াজাত জ্বালানির জোগান প্রত্যাশার চেয়ে বেড়েছে। বিষয়টিকে বাজারের নিম্নমুখী প্রবণতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন এগেইন ক্যাপিটালের বিশ্লেষক জন কিলডাফ।

যদিও বাজারে সাময়িক দরপতন ঘটেছে, তবু বহু অর্থনীতিবিদ এখনও পরিস্থিতিকে ভঙ্গুর মনে করছেন। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাতের কারণে ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি বলেই ইঙ্গিত দিচ্ছে আর্থিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রিটারবুশ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস। ইয়েমেন সংলগ্ন এলাকায় সৌদি তৎপরতা এবং পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এই উদ্বেগকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আর্থিক সংস্থা সিটি ব্যাংকের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ভূরাজনৈতিক সংকট জ্বালানির দর উচ্চ রাখলেও চলতি বছরের শেষ ভাগে কূটনৈতিক পথ ধরে সমুদ্রপথ পুনরায় সচল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বর্তমান অস্থিরতার মধ্যে বাজারে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে ডিজেল খাত। একদিকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পরিশোধিত তেলের সরবরাহ সংকুচিত হয়েছে, অন্যদিকে রাশিয়ার অভ্যন্তরে শোধনাগারে ক্ষয়ক্ষতির ফলে চরম ঘাটতি তৈরি হয়েছে। মস্কো ডিজেল রপ্তানির ওপর বিদ্যমান কড়াকড়ির মেয়াদ আরও বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় অঞ্চলে যুদ্ধ পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান ছাড়া ডিজেল ও বিমান জ্বালানির বাজারে স্বাভাবিকতা ফিরে আসা কঠিন।



সূত্র : রয়টার্স