রবিবার, 8 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

কিডনি ডায়ালাইসিসে বাড়তি খরচের আশঙ্কা, অনিশ্চয়তায় ৫০০ রোগী

সরকারি উদ্যোগে কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস সেবার পরিধি বাড়াতে নতুন করে ৬০টি হেমোডায়ালাইসিস সরঞ্জাম ক্রয়ের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

কিডনি ডায়ালাইসিসে বাড়তি খরচের আশঙ্কা, অনিশ্চয়তায় ৫০০ রোগী
সরকারি উদ্যোগে কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস সেবার পরিধি বাড়াতে নতুন করে ৬০টি হেমোডায়ালাইসিস সরঞ্জাম ক্রয়ের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

তবে এই মহতী উদ্যোগের মাঝেও চিকিৎসা ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধির একটি প্রবল শঙ্কা তৈরি হয়েছে। মূলত যন্ত্রগুলো সচল রাখতে নির্দিষ্ট কোম্পানির রাসায়নিক উপাদানের ওপর একচেটিয়া নির্ভরতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতির কারণেই এমন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এর পাশাপাশি আগামী ২৯ নভেম্বর সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগের অধীনে পরিচালিত দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ডায়ালাইসিস সেন্টারের চুক্তির মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে। জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের প্রায় ৫০০ কিডনি রোগীর নিয়মিত চিকিৎসা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।

গত শনিবার রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী রোগী ও তাদের স্বজনরা এই সংকট নিরসনে কেন্দ্র দুটি সচল রাখার জোর দাবি জানান। ডায়ালাইসিস সেন্টার রক্ষা ও রোগী কল্যাণ কমিটি নামের একটি সংগঠন ওই সভার আয়োজন করে। সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোর ডিপো থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জিআর-২৬২২ প্যাকেজের আওতায় নতুন যন্ত্রগুলো কেনার জন্য গত সোমবার দরপত্র উন্মুক্ত করা হয়। এতে মোট চারটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। দরপত্রে তামাম করপোরেশন প্রায় ১০ কোটি ৬৮ লাখ টাকার সর্বনিম্ন দর প্রস্তাব করেছে এবং এর ঠিক পরেই অবস্থান করছে বেলাল অ্যান্ড ব্রাদার্স, যাদের প্রস্তাবিত মূল্য আট লাখ ৫৮ হাজার ডলার। আশ্চর্যজনকভাবে এই দুই দরের মাঝে তফাৎ মাত্র ৩০০ ডলারের কাছাকাছি।

দরপত্রের নথিপত্র গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রস্তাবিত ৬০টি সরঞ্জামের মধ্যে ৫৫টিতেই ১০ ইঞ্চি মাপের মনিটর চাওয়া হয়েছে। সবচেয়ে আক্ষেপের বিষয় হলো, এই যন্ত্রগুলোতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিকতম সংযোজন অনলাইন হেমোডায়াফিলট্রেশন সুবিধার কোনো উল্লেখ রাখা হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ পদ্ধতির চেয়ে এই বিশেষ প্রযুক্তি অনেক বেশি কার্যকর। এটি মানবদেহের রক্ত থেকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকৃতির ক্ষতিকর বর্জ্য নিখুঁতভাবে বের করে আনতে সক্ষম। এই আধুনিক পদ্ধতি রোগীদের শারীরিক নানা জটিলতা কমিয়ে এনে চিকিৎসার গুণগত মান বাড়াতে দারুণ ভূমিকা রাখে। তাই নতুন আধুনিক সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে কেন রোগীদের জন্য এই অত্যাবশ্যকীয় সুবিধাটি এড়িয়ে যাওয়া হলো, তা নিয়ে চিকিৎসাসংশ্লিষ্টদের মাঝে তুমুল সমালোচনা চলছে।

নতুন এই সরঞ্জামগুলোর রাসায়নিক জীবাণুমুক্তকরণ প্রক্রিয়া নিয়েও বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী, প্রতিবার ডায়ালাইসিসের পর নির্দিষ্ট কেমিক্যাল দিয়ে যন্ত্রটি শতভাগ পরিষ্কার করতে হয়। ফ্রেসেনিয়াস ব্র্যান্ডের নির্দিষ্ট একটি মডেলের ক্ষেত্রে কোন ধরনের রিয়েজেন্ট ব্যবহার করা হবে, দরপত্রে তা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়নি। জীবাণুমুক্ত করার প্রক্রিয়াটি উন্মুক্ত নাকি আবদ্ধ পদ্ধতির হবে এবং বিকল্প কোনো কোম্পানির উপাদান ব্যবহারের সুযোগ থাকবে কি না, সেসব বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা নেই। বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, যদি নির্দিষ্ট কোনো প্রস্তুতকারকের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হয়, তবে ভবিষ্যতে তারা ইচ্ছামতো দাম বাড়ানোর সুযোগ পাবে। এমনটা ঘটলে প্রতিটি সেশনে ডায়ালাইসিসের খরচ পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত লাফিয়ে বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

শনিবারের সংবাদ সম্মেলনে লুৎফুর রহমান রিপন নামের এক রোগীর স্বজন লিখিত বক্তব্যে জানান, সরকারি ব্যবস্থাপনায় নামমাত্র খরচে সেবার কথা বলা হলেও বাস্তবে রোগীদের পদে পদে সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হতে হয়। সরকারি হাসপাতালে সেবা পেতে হলে শুরুতেই নগদ ২০ হাজার টাকা অগ্রিম জমা দিতে হয়, যার মেয়াদ নির্ধারিত থাকে মাত্র ছয় মাস। সবচেয়ে অমানবিক দিক হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, এই সময়ের মধ্যে কোনো রোগীর অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু হলে জমানো টাকার অবশিষ্ট অংশ শোকাহত পরিবারকে আর ফেরত দেওয়া হয় না। দীর্ঘ আট বছর ধরে সপ্তাহে তিন দিন স্বজনের ডায়ালাইসিস করাতে গিয়ে তার পরিবার আজ আর্থিকভাবে পুরোপুরি নিঃস্ব বলে তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান।

বর্তমানে জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটে ১৩০ জন এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৭০ জন রোগী যৌথ উদ্যোগের আওতায় নিয়মিত ডায়ালাইসিস করাচ্ছেন। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সরকারি সাধারণ ব্যবস্থার চেয়ে এই কেন্দ্রগুলো অনেক বেশি নিরাপদ ও সাশ্রয়ী হওয়ায় নিম্ন আয়ের রোগীরা এখান থেকেই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হচ্ছেন। তাই কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া এই কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে সহায় সম্বলহীন বিপুলসংখ্যক অসহায় মানুষের জীবন মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হবে বলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো মনে করছে।