ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সঙ্গে চলমান তীব্র সংঘাতের ইতি টানতে আলোচনার পথকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে তেহরান। যুদ্ধাবস্থা অবসানে গঠনমূলক সংলাপই একমাত্র কার্যকর উপায় বলে মনে করছে দেশটি। একই সাথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে পূর্বঘোষিত শর্তাবলীতে অনড় থাকার বার্তা দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের বরাতে এসব তথ্য সামনে আসে।
রোববার এক ভার্চুয়াল বার্তায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্পষ্ট করেন, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে পুনরায় যান চলাচলের বিষয়টি তাদের মৌলিক দাবিগুলো মেনে নেওয়ার ওপরই নির্ভর করছে। বর্তমান জটিল রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য পারস্পরিক সমঝোতা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই বলেও তিনি সতর্ক করেন।
এর আগে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের অবসরে কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের কাছে একটি সমন্বিত শান্তি রূপরেখা পাঠায় তেহরান। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবারই সেই খসড়া চুক্তি নাকচ করে দেওয়ার কথা প্রকাশ্যে জানান। ট্রাম্পের দাবি, তেহরান অভ্যন্তরীণভাবে মারাত্মক সংকটে পড়েই দ্রুত জলপথটি উন্মুক্ত করার জন্য এমন আপস প্রস্তাব হাজির করেছে।
যদিও ট্রাম্পের এমন বিবৃতির বিপরীতে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রস্তাব নাকচ হয়ে যাওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা মধ্যস্থতাকারী দোহার পক্ষ থেকে তারা এখনো পাননি। মধ্যস্থতাকারীদের আনুষ্ঠানিক বার্তার পরেই ওয়াশিংটনের চূড়ান্ত দৃষ্টিভঙ্গি মূল্যায়ন করে পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করবে তেহরান।
তেহরানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করতে মার্কিন প্রশাসন ইতোমধ্যে নতুন করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণের অভিযোগ এনে পশ্চিমা চাপের কারণে বিশ্বের এই অন্যতম কৌশলগত জ্বালানি পরিবহন রুটে পণ্যবাহী জাহাজের আনাগোনা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে।
মার্কিন প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ইরানের প্রস্তাবিত শর্তাদি মানা নিয়ে সন্দিহান থাকায় ট্রাম্প এটি প্রত্যাখ্যানের পথে হেঁটেছেন। এমনকি আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর তেহরানের ওপর পুনরায় তীব্র বিমান হামলা চালানোর বিষয়েও তিনি নিজস্ব উপদেষ্টামণ্ডলীকে আভাস দিয়েছেন। যদিও এর আগে অন্য এক মার্কিন নীতিনির্ধারক মধ্যস্থতাকারীদের উদ্যোগকে ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখেছিলেন।
ইরানের রূপরেখা অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ইতিবাচক সাড়া দিলে এক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর পাশাপাশি আঞ্চলিক সামরিক সংঘাতগুলো স্থগিত রাখার সুযোগ রাখা হয়েছিল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের আগেই জানিয়েছিলেন, মার্কিন পক্ষ আন্তরিক হলে বিস্তৃত সমঝোতা শুরুর পূর্ণ রসদ তেহরানের প্রস্তুত রয়েছে।
সম্ভাব্য সেই সংলাপের আওতায় ইরানের পরমাণু গবেষণা কর্মসূচির বিষয়টিও আসতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতা অর্জন থেকে দূরে রাখার বিষয়ে কড়া অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে রয়টার্সকে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, শান্তি চুক্তিতে সম্মতি এলেও জাতীয় পরমাণু কর্মসূচি ইস্যুতে বিন্দুমাত্র আপস করা হবে না।
ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও সংলাপের সদিচ্ছা পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, পরমাণু প্রকল্পসহ যাবতীয় ইস্যু নিয়ে কথা বলতে তার দেশ প্রস্তুত থাকলেও কোনো ধরনের সামরিক আধিপত্য বা জোরজবরদস্তির কাছে মাথা নত করা হবে না। তাঁর দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা, তেহরান আগ বাড়িয়ে সংঘাত চায় না, তবে যেকোনো বহিঃশত্রুর হুমকি ও আগ্রাসন প্রতিহতে সর্বোচ্চ প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
সূত্র: রয়টার্স