বিশ্বের বেশ কয়েকটি উন্নত রাষ্ট্রে আচমকা নাগরিকদের তিন থেকে সাত দিনের প্রয়োজনীয় আহার ও পানীয় সংরক্ষণের তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় এমন সতর্কবার্তার পর দোকানগুলোতে টিনজাত খাদ্য, পানীয় জলের বোতল, ব্যাটারিচালিত রেডিও এবং টর্চ কেনার ধুম পড়েছে। এতে জনমনে শঙ্কা জেগেছে, বিশ্ব কি আসন্ন কোনো মহাবিপর্যয় বা বৃহৎ সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে?
সম্প্রতি ব্রিটেনে ‘বি রেডি’ শীর্ষক এক প্রচারাভিযান চালু করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো যেকোনো চরম বিপর্যয় বা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার প্রথম ৭২ ঘণ্টা সাধারণ মানুষ যেন নিজেদের প্রাথমিক চাহিদাগুলো নিজেরাই মেটাতে পারে। দেশটির সরকার প্রতিটি মানুষের জন্য দৈনিক তিন লিটার পানি, সহজে নষ্ট হয় না এমন খাবার, জরুরি ওষুধপত্র, পাওয়ার ব্যাংক এবং হাত দিয়ে চালানো যায় এমন রেডিও সংরক্ষণ করার নির্দেশনা দিয়েছে। লন্ডনের নীতি-নির্ধারকদের মতে, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় সাইবার হামলা হলে উদ্ধারকর্মীদের পক্ষে তাৎক্ষণিক সব জায়গায় পৌঁছানো দুরূহ হতে পারে। নাগরিকরা নিজেদের ব্যবস্থা নিজেরা করতে পারলে কর্তৃপক্ষ অতি-ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের দ্রুত সহায়তা করতে পারবে।
সরকারি এমন বার্তার পর যুক্তরাজ্যের বাজারে এর গভীর প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। আইসল্যান্ড নামের একটি সুপারশপে রাতারাতি টিনজাত পণ্যের বিক্রি প্রায় শতকরা ৪০ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সঙ্গে ইলেকট্রনিক সামগ্রীর দোকানে রেডিওর চাহিদা ১৬০ শতাংশ এবং টর্চলাইটের চাহিদা প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা আশ্বস্ত করেছেন যে সরবরাহ চেইন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক আছে এবং দেশে খাদ্যের কোনো অভাব নেই।
শুধু ব্রিটেন নয়, নিউজউইকের তথ্যমতে কানাডা, জাপান, মেক্সিকো ও নেদারল্যান্ডসও তাদের নাগরিকদের অন্তত তিন দিনের জরুরি প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। অন্যদিকে, নরওয়ে ও সুইডেন এক সপ্তাহ এবং জার্মানি টানা ১০ দিনের রসদ জমিয়ে রাখার পরামর্শ দিচ্ছে। অঞ্চলভেদে এই প্রস্তুতির কারণ অবশ্য ভিন্ন। জাপানে ভূমিকম্প ও সুনামির ওপর জোর দেওয়া হয়, আবার মেক্সিকো বা অস্ট্রেলিয়ায় ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলাই প্রধান লক্ষ্য থাকে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি পরিবর্তিত বিশ্বরাজনীতি এবং সংঘাতের সম্ভাবনাকেও বেশ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য ইউরোপীয় কমিশনের প্রিপেয়ার্ডনেস ইউনিয়ন স্ট্র্যাটেজিতে জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি সাইবার হামলা ও বহিরাগত আগ্রাসনের মতো বিষয়গুলো স্থান পেয়েছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান রাষ্ট্র সুইডেন তাদের নাগরিকদের জন্য তৈরি নির্দেশিকায় সরাসরি যুদ্ধাবস্থায় টিকে থাকার কৌশল যুক্ত করেছে। যদিও বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি উত্তর ইউরোপীয় দেশগুলোর পুরনো একটি চর্চা, নতুন কোনো যুদ্ধের পূর্বাভাস নয়।
এদিকে সামরিক ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির খবর পাওয়া গেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ তাদের ফোর্ট্রেস আমেরিকা উদ্যোগের আওতায় সামরিক ঘাঁটিগুলোকে বাইরের সাহায্য ছাড়া অন্তত ৯০ দিন সচল রাখার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এর আওতায় নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, বর্ধিত সাইবার নিরাপত্তা এবং দ্বিগুণ জরুরি মজুত নিশ্চিত করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেছেন, এটি কেবল সামরিক স্থাপনার নিরাপত্তার জন্য, সাধারণ মানুষের জন্য এমন কোনো নির্দেশনা নেই।
বিবিসি, স্কাই নিউজ, দ্য গার্ডিয়ানের মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সরকারি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব সতর্কতার পেছনে আসন্ন কোনো যুদ্ধের সুনির্দিষ্ট ইঙ্গিত নেই। মূলত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বৈরী আবহাওয়া, আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং সাইবার হামলার মতো বহুমুখী সংকট মোকাবিলা করার জন্যই এই প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ের মহামারি, চরম আবহাওয়া ও বৈশ্বিক অস্থিরতার যুগে সাধারণ মানুষকে যেকোনো বিপর্যয়ে স্বাবলম্বী করে তোলাই আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর এই সম্মিলিত উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য। একে যুদ্ধের সংকেত হিসেবে ভেবে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।