বিশ্ববাজারে বাড়তি দর ও রাষ্ট্রায়ত্ত বিপিসির আর্থিক ঘাটতির যুক্তি দেখিয়ে দেশের বাজারে সব রকমের জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্য লিটারে একধাক্কায় কুড়ি টাকা বাড়িয়েছে প্রশাসন। নীতি-নির্ধারকদের এমন সিদ্ধান্তে সাধারণ জনগণের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মক সংকটে পড়বে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভোক্তা অধিকার বিষয়ক জাতীয় সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক আদেশ অনুযায়ী রোববার মধ্যরাত থেকেই কার্যকর হয়েছে পুনর্নির্ধারিত এই মূল্যতালিকা। নতুন নিয়মে প্রতি লিটার ডিজেল ক্রয়ে ভোক্তাকে গুনতে হবে একশত পঁয়ত্রিশ টাকা, পেট্রলের ক্ষেত্রে ব্যয় হবে একশত ষাট টাকা, অকটেনের দাম দাঁড়িয়েছে একশত পঁয়ষট্টি টাকায় এবং কেরোসিন মিলবে একশত পঞ্চান্ন টাকায়। এর পূর্বে চলতি বছরের এপ্রিলে এবং পরবর্তীতে জুন মাসে দফায় দফায় সমন্বয়ের পর সর্বশেষ ডিজেল একশত পনেরো, পেট্রল একশত চল্লিশ, অকটেন একশত পঁয়তাল্লিশ এবং কেরোসিন একশত পঁয়ত্রিশ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল।
দেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি যখন আট শতাংশের ওপর অবস্থান করছে, তখন নতুন এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আরও অনিয়ন্ত্রিত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ইতিপূর্বে বিদ্যুতের বিল বাড়ানো হয়েছিল, এবার বাড়ানো হলো তরল জ্বালানি, যার ধারাবাহিকতায় হয়তো গ্যাসের ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে। এতে প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের নাগরিকদের বেঁচে থাকা দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।
তিনি উল্লেখ করেন, সম্প্রতি সরকারি কর্মচারীদের বেতন বিপুল পরিমাণে বাড়ানো হলেও সুবিধাভোগীর এই সংখ্যা মাত্র চৌদ্দ লাখের মতো। দেশের সিংহভাগ মানুষের আর্থিক বাস্তবতা এখন অত্যন্ত করুণ। মানুষের পকেটে যদি ক্রয়ক্ষমতাই অবশিষ্ট না থাকে, তবে সরকার পরোক্ষ কর আদায় করবে কোথা থেকে। ফলে জ্বালানিতে আর্থিক অনুদান বা ভর্তুকি কিছুটা সংকোচনের চেষ্টা করা হলেও পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যয় ও পণ্যমূল্য দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও বিগত পাঁচ মাস অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখা হয়েছিল। এর ফলে মার্চ থেকে আগস্ট সময়কালে পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তহবিলে প্রায় বাইশ হাজার আটশত ছিয়াত্তর কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
সরকারি হিসাব মতে, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির নিরিখে প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় উননব্বই টাকা করে প্রতিদিন একশত নয় কোটি টাকার মতো আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। এই ঘাটতি অব্যাহত থাকলে বাৎসরিক ভিত্তিতে কেবল একটি পণ্যেই প্রায় চল্লিশ হাজার কোটি টাকা গচ্চা যাওয়ার শঙ্কা ছিল। বর্তমান সমন্বয়ের ফলে বাৎসরিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ অন্তত দশ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি কলকাতা, মিয়ানমার, নেপাল কিংবা পাকিস্তানের চেয়ে দাম লক্ষণীয় মাত্রায় কম থাকলে সীমান্ত দিয়ে চোরাচালানের শঙ্কা বেড়ে যায় বলেও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
অতীতে ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে আওয়ামী লীগ শাসনামলে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১১৪ টাকা করা হয়েছিল, যা নিয়ে ব্যাপক গণরোষ তৈরি হওয়ার পর নামমাত্র ৫ টাকা কমানো হয়। সেই সময়ের সেই অস্বাভাবিক পদক্ষেপের ধাক্কায় গোটা দেশের পণ্যমূল্য ও পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছিল।