টানা বিক্ষোভে অস্থির ইরানে এবার সরাসরি কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিলেন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। দেশজুড়ে চলমান আন্দোলনের মধ্যে তিনি ‘ঐক্যের’ আহ্বান জানিয়ে সতর্ক করে বলেছেন, অস্থিরতা দমনে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
শুক্রবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভাষণে খামেনি বলেন, চলমান বিক্ষোভকে সরকার ‘সন্ত্রাসী তৎপরতা’ হিসেবে দেখছে এবং এর পেছনে বিদেশি শক্তির ষড়যন্ত্র রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, বিদেশি শত্রুরা ইরানকে অস্থিতিশীল করতে এসব কর্মকাণ্ড উসকে দিচ্ছে।
খামেনি অভিযোগ করেন, বিক্ষোভকারীরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বার্থে কাজ করছে এবং সরকারি সম্পত্তিতে হামলা চালাচ্ছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বিদেশিদের ‘ভাড়াটে হিসেবে’ কাজ করলে তা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। এ সময় তিনি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, তাঁর হাত ইরানিদের রক্তে “রঞ্জিত”।
ডিসেম্বর ২৮ থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে তেহরান। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত অন্তত কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত চার সদস্য নিহত হয়েছেন।
এদিকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সংযমের আহ্বান জানিয়ে ‘যৌক্তিক ও বাস্তব অভিযোগ’ শোনার কথা বললেও সরকারের অন্য অংশ থেকে কঠোর বার্তা দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, বিদেশি শক্তির সমর্থন থাকায় বিক্ষোভকারীদের প্রতি কোনো শিথিলতা দেখানো হবে না।
ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন, যোগাযোগ অচল
অর্থনৈতিক সংকট, বিশেষ করে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের বড় ধরনের দরপতনের প্রতিবাদ থেকেই মূলত এই আন্দোলনের সূত্রপাত। তেহরানের ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ থেকেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন এলাকায়।
বিক্ষোভ দমনে বৃহস্পতিবার থেকে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। শুক্রবারও এই ব্ল্যাকআউট বজায় ছিল। একই সঙ্গে মোবাইল ও টেলিফোন যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটে এবং দেশটির বিমান চলাচলও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়।
তবে এসব নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে আগুন জ্বালিয়ে সরকারবিরোধী স্লোগান দিতে দেখা যায় বিক্ষোভকারীদের।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম শুক্রবার দাবি করে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘সন্ত্রাসী এজেন্টরা’ সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগে জড়িত। এতে হতাহতের কথা স্বীকার করা হলেও বিস্তারিত জানানো হয়নি।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার আবারও সতর্ক করে বলেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যা করলে ইরানকে ‘ভয়াবহ মূল্য’ দিতে হবে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানকে “খুব শক্তভাবে” জানানো হয়েছে, এমন কিছু হলে তারা রেহাই পাবে না।
তবে ট্রাম্প ইরানের সাবেক রাজপরিবারের উত্তরাধিকারী হিসেবে পরিচিত রেজা পাহলভির সঙ্গে বৈঠক নাকচ করে দিয়েছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, তেহরানের সরকার পতন হলে নতুন নেতৃত্বকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে ওয়াশিংটন এখনো প্রস্তুত নয়।
ইরানের শেষ শাহের ছেলে রেজা পাহলভি আরও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সিনিয়র ফেলো হলি ডাগরেস অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, পাহলভির আহ্বানই আন্দোলনে নতুন গতি এনেছে। তাঁর ভাষায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে—ইরানিরা ইসলামিক প্রজাতন্ত্র উৎখাতের লক্ষ্য নিয়ে বিক্ষোভে নামতে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছেন।
ডাগরেস আরও বলেন, “এই কারণেই ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছে—যাতে বিশ্ব বিক্ষোভ দেখতে না পায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এতে নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য বিক্ষোভকারীদের হত্যা করার সুযোগও তৈরি হয়েছে।”
ভাষণে খামেনি বলেন, বিক্ষোভকারীরা “অন্য দেশের প্রেসিডেন্টকে খুশি করতে নিজেদের রাস্তাঘাট ধ্বংস করছে।” ভাষণ চলাকালে উপস্থিত জনতাকে ‘মৃত্যু হোক আমেরিকার’ স্লোগান দিতেও শোনা যায়।
আল জাজিরার প্রতিবেদন