মঙ্গল গ্রহের অভ্যন্তরে এক বিশাল ও সুদীর্ঘকাল স্থায়ী ম্যাগমা বা গলিত লাভার ব্যবস্থার সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার ‘ইনসাইট’ মিশনের পাঠানো বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি করা হয়েছে।
এই নতুন তথ্য লাল গ্রহের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের বহু বছরের প্রচলিত ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে। এর পাশাপাশি সৌরজগতের বাইরে থাকা অন্যান্য পাথুরে গ্রহগুলোতেও প্রাণের অনুকূল পরিবেশ থাকার সম্ভাবনাকে আগের চেয়ে অনেক বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে।
যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্টের একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সাম্প্রতিক এই গবেষণায় মঙ্গলের ভূত্বকের অনেক গভীরে একটি সুপ্ত ও বিশাল ম্যাগমা চেম্বারের অস্তিত্বের প্রমাণ মিলেছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই আবিষ্কারটি ইঙ্গিত করে যে কোনো এক সময়ে মঙ্গল গ্রহেও পৃথিবীর মতোই দীর্ঘস্থায়ী ম্যাগমা প্রবাহ সক্রিয় ছিল। এই গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো, মঙ্গলে পৃথিবীর মতো গতিশীল কোনো প্লেট টেকটোনিক্স বা ভূত্বকীয় পাতের চলন ব্যবস্থা নেই। এতদিন পর্যন্ত বিজ্ঞানী মহলের ধারণা ছিল, প্লেট টেকটোনিক্সের উপস্থিতি ছাড়া এত বড় এবং জটিল ম্যাগমা চক্র গড়ে ওঠা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কিন্তু নতুন এই আবিষ্কার সেই প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
গবেষকদের মতে, মঙ্গলের এই বিশেষ ভূতাত্ত্বিক গঠন প্রমাণ করে যে টেকটোনিক প্লেটের গতিশীলতা না থাকলেও যেকোনো গ্রহে জটিল ভূত্বক ও দীর্ঘমেয়াদি ম্যাগমা ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। ফলে দূর মহাবিশ্বের অনেক পাথুরে গ্রহেও প্রাণের বিকাশ ঘটার মতো উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হওয়া সময়ের নিরিখে অসম্ভব কিছু নয়। সাধারণত মঙ্গলকে একটি ‘স্থবির ঢাকনা’ বা অপরিবর্তনশীল গ্রহ হিসেবে গণ্য করা হয়, কারণ পৃথিবীর মতো এর উপরিভাগ কোনো টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত নয়। পৃথিবীতে নতুন পর্বতমালা, মহাদেশ গঠন কিংবা আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তার পেছনে এই প্লেটগুলোর ভূমিকা রয়েছে। ফলে এতদিন ভাবা হতো মঙ্গলে কখনো জটিল কোনো ভূতাত্ত্বিক বিবর্তন ঘটেনি। তবে নতুন গবেষণা বলছে, মঙ্গল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় নিজস্ব উপায়ে অত্যন্ত বিবর্তিত একটি ভূত্বক তৈরি করে নিয়েছিল।
এই গবেষণার কাজে নাসার ইনসাইট ল্যান্ডারের সংগ্রহ করা সিসমিক বা ভূকম্পনসংক্রান্ত ডেটা ব্যবহার করা হয়েছে। মঙ্গলের বুকে বিভিন্ন সময়ে উল্কাপিণ্ডের আছড়ে পড়া এবং ‘মার্সকোয়েক’ বা মঙ্গল-কম্পনের ফলে উৎপন্ন হওয়া সিসমিক তরঙ্গগুলো নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করে গ্রহটির ভেতরের স্তর সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা এই অজানা তথ্য উন্মোচন করেছেন। গবেষকেরা মঙ্গলের পৃষ্ঠদেশ থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার গভীরে থাকা একটি রহস্যময় শিলাস্তর নিয়ে কাজ করেন। নাসার ডেটার সাথে বিভিন্ন পাথরের রাসায়নিক ও গাঠনিক বৈশিষ্ট্যের তুলনা করে তারা দেখতে পান, ওই স্তরের নিচের অংশটি মূলত লোহা ও ম্যাগনেসিয়ামে ভরপুর আল্ট্রাম্যাফিক শিলা দিয়ে তৈরি। অপরদিকে এর ওপরের স্তরটিতে রয়েছে তুলনামূলকভাবে বেশি সিলিকাসমৃদ্ধ ম্যাফিক শিলা।
গবেষণা নিবন্ধের প্রধান লেখক এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক টোবারমোরি ম্যাককে-চ্যাম্পিয়ন জানান, আগে মনে করা হতো পৃথিবীর তুলনায় মঙ্গলের আগ্নেয়গিরির কর্মযজ্ঞ ছিল খুবই সাধারণ ও নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ। তবে নতুন এই ফলাফল পরিষ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে যে মঙ্গলের গভীরে সুদীর্ঘকাল ধরে একটি সক্রিয় ম্যাগমা ব্যবস্থা সচল ছিল, যেখানে গলিত শিলা অনবরত রূপান্তরিত হয়ে পুরো ভূত্বকটিকে নতুন রূপ দিয়েছে। তার মতে, এই আবিষ্কার সৌরজগতের বাইরের পাথুরে গ্রহগুলোর ভূতাত্ত্বিক বিকাশ নিয়ে বিজ্ঞানের দরবারে নতুন প্রশ্ন ও সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
গবেষণার অন্যতম সহ-লেখক এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী জন ওয়েড জানান, গ্রহবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় জিজ্ঞাসাগুলোর একটি হলো—মহাবিশ্বে পৃথিবীই কি একমাত্র অনন্য গ্রহ? যদি মঙ্গল গ্রহ প্লেট টেকটোনিক্সের সাহায্য ছাড়াই এত জটিল একটি ভূত্বক তৈরি করতে সক্ষম হয়, তবে আমরা পূর্বে যা অনুমান করেছিলাম, তার চেয়েও অনেক বেশি গ্রহের বুকে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ গড়ে ওঠার সুযোগ রয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, যেসব গ্রহকে কেবল তাদের ছোট আকার বা টেকটোনিক সক্রিয়তা না থাকার কারণে এতদিন বাসযোগ্য গ্রহের সম্ভাবনার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোকে এখন নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করার সময় এসেছে।