ফিলিস্তিনের সশস্ত্র প্রতিরোধ যোদ্ধাদের হাতে জিম্মি থাকা ইসরায়েলি নাগরিকদের প্রাণহানির সুনির্দিষ্ট আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও গাজা উপত্যকায় সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন ইসরায়েলের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ত।
তেল আবিবের আগ্রাসনে হামাসসহ অন্যান্য গোষ্ঠীর হেফাজতে থাকা বন্দীরা মারা যেতে পারেন—এমন সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন বলে নিজেই স্বীকার করেছেন।
ইসরায়েলি গণমাধ্যম ইয়েদিওথ আরোনাথ এবং চ্যানেল-১২-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে গ্যালান্ত জানান, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর এবং ২৭ অক্টোবর গাজায় স্থল অভিযান শুরুর প্রাক্কালে তাঁর কাছে স্পষ্ট সতর্কবার্তা ছিল যে, সামরিক পদক্ষেপের কারণে জিম্মিরা নিহত হতে পারেন। তবে সমস্ত ঝুঁকি উপেক্ষা করে তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এবং স্থল হামলা বাস্তবায়নের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেন।
সাবেক এই প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে বলেছিলেন যে, হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে কেবল একটি জায়গাতেই মিল রয়েছে; আর তা হলো উভয় পক্ষই জিম্মিদের ধরে রাখতে চায়। হামাস তাদের দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে দেখছে, আর ইসরায়েল তাদের নিজেদের নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করছে।
গ্যালান্ত আক্ষেপ করে বলেন, তিনি দায়িত্বে থাকাকালে ইসরায়েল সরকার জিম্মিদের জীবিত উদ্ধার করার জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। উল্টো সামরিক বাহিনীকে বিতর্কিত ‘হ্যানিবাল নির্দেশনা’ কার্যকরের আদেশ দেওয়া হয়েছিল, যে সামরিক নীতি অনুযায়ী জিম্মিকারীদের পাশাপাশি খোদ জিম্মিদেরও প্রয়োজনে হত্যা করার অবকাশ থাকে। একই সঙ্গে তিনি ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা বিপর্যয় নিয়ে সরকারের অভ্যন্তরে একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের তাগিদ দেন।
ইসরায়েলের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এই ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে নিলেও প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এখন পর্যন্ত তা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এমনকি এই ঘটনার পেছনে কার কী ভূমিকা ছিল, তা খতিয়ে দেখতে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিশন গঠনেও তিনি ক্রমাগত বাধা দিয়ে আসছেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৭ অক্টোবরের ওই ঘটনাটি ইসরায়েলের ইতিহাসে অন্যতম বড় গোয়েন্দা ও সামরিক ব্যর্থতা।
সাক্ষাৎকারে গ্যালান্ত আরও দাবি করেন, দেশটির উগ্রপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মতরিচ একাধিকবার সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের হুমকি দিয়ে জিম্মি বিনিময় চুক্তি ভেস্তে দিতে ভূমিকা রেখেছিলেন। অথচ ২০২৪ সালের মধ্যেই তেল আবিব একটি কার্যকর চুক্তিতে পৌঁছাতে পারত। এ ছাড়া পদত্যাগ করা জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, আল-আকসা মসজিদে ওই মন্ত্রীর বারবার উসকানিমূলক প্রবেশ পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তুলেছিল, যা ৭ অক্টোবরের হামলার ক্ষেত্র তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
গাজায় নতুন করে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের অসারতা তুলে ধরে সাবেক এই মন্ত্রী সতর্ক করেন, সেখানে দীর্ঘমেয়াদে সামরিক শাসন বজায় রাখা কিংবা নতুন বসতি গড়া ইসরায়েলের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনবে। উল্লেখ্য, গাজা যুদ্ধ নিয়ে তীব্র মতবিরোধের জেরে গত বছরের নভেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ইয়োভ গ্যালান্তকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে ইসরায়েল কাৎজকে সেই দায়িত্বে নিয়োজিত করেন।