বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা, নেতাকর্মীদের মারধর ও কার্যালয় অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনায় নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। মঙ্গলবার পৃথক বিবৃতিতে তাঁরা হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
এ ঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করে বামপন্থী জোট গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট। এতে জোটের নেতাদের পাশাপাশি বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশুসহ অন্যরা অংশ নেন।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে সোমবার রাতে রাজধানীর পুরানা পল্টনে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। ছাত্র ইউনিয়ন ও যুব ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এ হামলা চালান। এ সময় সিপিবির কয়েকজন নেতাকর্মীকে মারধর করা হয় বলেও তাঁদের অভিযোগ।
তবে পুলিশের ভাষ্য, মিছিলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও যুবদলের লোকজনের সঙ্গে সিপিবির নেতাকর্মীদের উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।
সিপিবির এক বিবৃতিতে বলা হয়, সোমবার রাত ১০টার দিকে লাঠিসোঁটা হাতে একদল ‘উগ্র ও উশৃঙ্খল’ ব্যক্তি নিজেদের সরকারদলীয় কর্মী পরিচয় দিয়ে মুক্তি ভবনের সামনে জড়ো হন। সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের সদস্যরা অবস্থান করছেন—এমন দাবি করে তাঁরা প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সিপিবির নেতাকর্মীরা বাধা দিলে হামলাকারীরা সহিংসতা শুরু করেন। এতে কয়েকজন আহত হন। পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে কার্যালয়ের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার পরও দীর্ঘ সময় কার্যালয়টি অবরুদ্ধ রাখা হয়। এ সময় কথিত কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের সদস্যদের পুলিশের কাছে হস্তান্তরের দাবিও জানানো হয়।
এদিকে মঙ্গলবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান আশ্বাস দিয়েছেন, সিপিবি কার্যালয়ে হামলাসহ এ ধরনের অপরাধের ঘটনায় সরকার ব্যবস্থা নেবে।
রাজনৈতিক সহাবস্থান নিশ্চিতের আহ্বান
সিপিবি কার্যালয়ে হামলা ও ‘মব’ সৃষ্টির ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এক বিবৃতিতে বলেন, নির্বাচিত সরকারের আমলে এ ধরনের হামলা মেনে নেওয়া যায় না।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভিন্নমত ও ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো এবং সব দলের স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক বিরোধের জবাবে হামলা, ভয়ভীতি ও সহিংসতার আশ্রয় নেওয়া গণতান্ত্রিক পরিবেশকে বিপন্ন করে।
সাইফুল হকের মতে, স্বাধীন দেশে রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে হামলা, নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়া আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে তিনি সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফনে বাধা দেওয়া এবং সিপিবি কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল—জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব ও সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন।
সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে তাঁরা বলেন, রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে হামলা এবং ভিন্নমতের ওপর সহিংসতা গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের পরিপন্থী।
জেএসডির এই দুই নেতা আরও বলেন, ‘জয় বাংলা’ কোনো একক রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি মহান মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্লোগান। এ স্লোগানকে দলীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার করা কিংবা এর সূত্র ধরে সহিংসতায় জড়ানো মুক্তিযুদ্ধের সর্বজনীন চেতনার পরিপন্থী।
একই ঘটনায় যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন গণসংহতি আন্দোলনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান সমন্বয়কারী দেওয়ান আবদুর রশিদ নীলু ও নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল। তাঁরা অবিলম্বে ঘটনার তদন্ত করে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলের কার্যালয় ও নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।