মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ ইরানের অবরোধে কার্যত অচল হয়ে আছে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তীব্র সংকট তৈরি করেছে এই অবরোধ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ধারাবাহিকভাবে হরমুজ প্রণালী মুক্ত করার কথা বললেও, সম্প্রতি তিনি কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করেই এ যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছেন। এ ঘটনা নিয়ে নীতিনির্ধারণী মহলে তীব্র আলোচনা চলছে।
হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ট্রাম্প ও তাঁর উপদেষ্টারা পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করেছেন। তাদের মূল্যায়নে, শক্তি প্রয়োগ করে এই স্পর্শকাতর জলপথ পুনরায় চালু করা দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। শুরু থেকেই এই যুদ্ধে ৪ থেকে ৬ সপ্তাহের সময়সীমা নির্ধারণ করেছিলেন ট্রাম্প, কিন্তু হরমুজ খুলতে পূর্ণাঙ্গ অভিযান চালালে সেই সময়সীমা অতিক্রম করা অবশ্যম্ভাবী।
প্রশাসনের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে তার মূল সামরিক লক্ষ্যগুলো অর্জন করেছে। বিশেষ করে ইরানের নৌ সক্ষমতা দুর্বল করা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ও প্রতিরক্ষা শিল্পে বড় ধরনের ক্ষতি করা সম্ভব হয়েছে। ফলে এখন সরাসরি যুদ্ধের বদলে কূটনৈতিক চাপ বাড়িয়ে তেহরানকে আলোচনায় বসাতে চায় ওয়াশিংটন।
তবে যদি চাপের মুখেও ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে না দেয়, তাহলে ইউরোপীয় ও উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর দায়িত্ব চাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। ট্রাম্পের মতে, এই রুটটি আমেরিকার তুলনায় ইউরোপ ও এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যদিও সামরিক বিকল্প এখনও বিবেচনায় আছে, তা আপাতত অগ্রাধিকার তালিকায় নেই।
যুদ্ধ শেষের ইঙ্গিত দিলেও সামরিক উপস্থিতি কমাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র। বরং সম্প্রতি অঞ্চলটিতে মোতায়েন করা হয়েছে নৌবাহিনীর বিশেষ জাহাজ ইউএসএস ত্রিপোলি ও ৩১তম মেরিন এক্সপিডিশনারি ইউনিট। পাশাপাশি ‘৮২তম এয়ারবোর্ন’ ডিভিশনের সদস্যদের পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং অতিরিক্ত ১০ হাজার স্থলসেনা পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দের মতো উচ্চঝুঁকির অভিযানের সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করছে পেন্টাগন।
ওয়াশিংটনের ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ইরান বিশেষজ্ঞ সুজান ম্যালোনি এই অবস্থানকে তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, ‘আমেরিকা ও ইসরায়েল একসঙ্গে এই যুদ্ধ শুরু করেছে, এখন এর নেতিবাচক ফলাফল ফেলে তারা সরে যেতে পারে না।’ তিনি সতর্ক করে আরও বলেন, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজার আন্তঃনির্ভরশীল হওয়ায় হরমুজ বন্ধ থাকলে যুক্তরাষ্ট্রও গুরুতর অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়াতে পারবে না।
হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার প্রভাব ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দৃশ্যমান। সারের সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে, যা কৃষি উৎপাদনে চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে কম্পিউটার চিপ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় হিলিয়াম গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় প্রযুক্তি খাতেও ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে।
তেলের বাজারেও এর সরাসরি প্রতিক্রিয়া পড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড ইতিহাসের সর্বোচ্চ মাসিক বৃদ্ধির কাছাকাছি পৌঁছেছে, আর মার্কিন ক্রুড ফিউচার ২০২০ সালের পর সবচেয়ে শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার দিকে এগোচ্ছে। ১৯ মার্চের পর সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছানোর পর মে মাসের ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার ০০:০২ জিএমটি সময়ে ব্যারেলপ্রতি ২.২৬ ডলার বা ২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৫.০৪ ডলারে। একই সময়ে জুন মাসের তুলনামূলক সক্রিয় চুক্তির মূল্য ছিল ১০৮.৯৬ ডলার। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, দ্রুত জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, ট্রাম্প আশা করছেন ইরান শিগগিরই সমঝোতায় আসবে। তবে সোমবার এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে তিনি কঠোর সতর্কবার্তাও দিয়েছেন—হরমুজ প্রণালি দ্রুত বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত না হলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র ‘খার্গ আইল্যান্ড’-এ সরাসরি হামলার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে।
অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য অর্জনের প্রক্রিয়া আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হতে পারে। এরপর হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি এই সংকট কীভাবে সামাল দেয়, সেদিকেই এখন দৃষ্টি সবার।