শুক্রবার, 6 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

সৌদি যুদ্ধবিমান ভূপাতিতের দাবি হুতিদের, মক্কায় হামলার অভিযোগ অস্বীকার

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে। একই সময়ে সৌদি আরব জানিয়েছে, পবিত্র মক্কা নগরীর কাছাকাছি একটি হুতি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে। তবে মক্কাকে লক্ষ্য করে কোনো হামলা চালানোর অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে হুতিরা। দুই পক্ষের পালটাপালটি দাবির মধ্য দিয়ে সৌদি আরব ও হুতিদের দীর্ঘদিনের সংঘাত আবারও বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনার দিকে এগোচ্ছে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সৌদি যুদ্ধবিমান ভূপাতিতের দাবি হুতিদের, মক্কায় হামলার অভিযোগ অস্বীকার
সৌদি আরবের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান। ফাইল ছবি: সংগৃহীত

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে। একই সময়ে সৌদি আরব জানিয়েছে, পবিত্র মক্কা নগরীর কাছাকাছি একটি হুতি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে। তবে মক্কাকে লক্ষ্য করে কোনো হামলা চালানোর অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে হুতিরা। দুই পক্ষের পালটাপালটি দাবির মধ্য দিয়ে সৌদি আরব ও হুতিদের দীর্ঘদিনের সংঘাত আবারও বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনার দিকে এগোচ্ছে বলে আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

সৌদি যুদ্ধবিমান ভূপাতিতের দাবি হুতিদের

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বার্তায় সৌদি আরবের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেন। তাঁর দাবি, ইয়েমেনের আকাশসীমায় স্থানীয়ভাবে তৈরি একটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে যুদ্ধবিমানটি নামানো হয়েছে।

হুতিদের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা পৃথক এক বিবৃতিতেও একই দাবি করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের মারিব এলাকায় ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য স্থানীয়ভাবে তৈরি একটি ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে সৌদি যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত করা হয়েছে।

ইয়াহিয়া সারির ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনের মারিবের আকাশসীমায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনীর সামরিক তৎপরতায় সহায়তা করার সময় যুদ্ধবিমানটি লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে আল-জাজিরা জানিয়েছে, মারিবের উত্তর-পশ্চিমে মাউন্ট হেলানের কাছে হুতিরা সৌদি যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত করেছে বলে দাবি করেছে। তবে এ দাবির বিষয়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার হুতিদের দাবির বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

মক্কার কাছে হুতি ড্রোন ভূপাতিতের দাবি

এর আগে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন ইয়েমেনবিষয়ক সামরিক জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি জানিয়েছিলেন, মঙ্গলবার মক্কার দক্ষিণে একটি হুতি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। তাঁর দাবি, ড্রোনটি মক্কার ওপর নির্ধারিত নিষিদ্ধ আকাশসীমার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল।

তবে মক্কাকে লক্ষ্য করে কোনো হামলা চালানোর অভিযোগ জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে হুতিরা। হুতি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সৌদি আরবের এই অভিযোগকে ‘বানোয়াট ও মিথ্যা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ইয়েমেন থেকে পবিত্র স্থাপনাগুলোর জন্য কোনো ধরনের হুমকি নেই।

সৌদি পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, মক্কার কাছে যে ড্রোনটি ধ্বংস করা হয়েছে, সেটি পবিত্র নগরীর দিকে যাচ্ছিল। সৌদি জোটের মুখপাত্র আল-মালিকি বলেন, ড্রোনটি ‘পবিত্র মসজিদে আসা মুসল্লিদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং নাগরিক ও বাসিন্দাদের ক্ষতি করার চেষ্টা’ ছিল।

তিনি আরও বলেন, হাজিদের নিরাপত্তা এবং পবিত্র মসজিদগুলোর নিরাপত্তা সৌদি আরবের জন্য ‘লাল রেখা’।

মক্কা মুসলমানদের কাছে বিশ্বের সবচেয়ে পবিত্র স্থান। ইসলামের মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মস্থান এই নগরীতে প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ হজ পালনের জন্য সমবেত হন। সৌদি সরকারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর হজ পালন করতে ১৭ লাখের বেশি মানুষ মক্কায় গিয়েছিলেন। তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন বিদেশি।

মক্কার কাছাকাছি ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার ঘটনায় মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর জোট অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) নিন্দা জানিয়েছে। ৫৭ সদস্যের এই সংগঠন হুতিদের সৌদি আরবের বিরুদ্ধে চালানো অন্যান্য হামলারও সমালোচনা করেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ওআইসি বলেছে, এ ধরনের হামলা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে, পবিত্র স্থান ও মসজিদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে এবং বিশ্বের মুসলমানদের অনুভূতিতে আঘাত হানে।

মক্কাকে লক্ষ্য করে কথিত হামলার নিন্দা জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, এই ‘নিন্দনীয় ঘটনায়’ পাকিস্তানের জনগণ দুঃখিত ও উদ্বিগ্ন।

নতুন করে তীব্র হচ্ছে ইয়েমেনের সংঘাত

হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরব-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের সংঘাত দীর্ঘদিনের। তবে সাম্প্রতিক কয়েক দিনে পরিস্থিতি আবারও সরাসরি সামরিক সংঘাতের দিকে এগিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান যুদ্ধের সময়েই ইয়েমেনের সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ায় পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে হুতিদের লড়াই চলছে। ওই বছর হুতিরা রাজধানী সানা দখল করে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এরপর হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট।

সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হুতিরা একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইয়েমেনে হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে পালটা হামলা চালিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী।

সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হুতিদের ড্রোন পবিত্র মক্কা নগরীর দিকে পাঠানোর ঘটনার পর মঙ্গলবার সেখানে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। তবে মক্কা কিংবা অন্য কোনো পবিত্র স্থানকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে হুতিরা।

মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালেও হুতিদের বিরুদ্ধে মক্কা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের অভিযোগ উঠেছিল। সাম্প্রতিক ঘটনায় মক্কায় নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হলেও কয়েক মিনিটের মধ্যেই তা প্রত্যাহার করা হয়। একই ধরনের সতর্কতা তাইফ এবং সৌদি আরবের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর জেদ্দাতেও জারি করা হয়েছিল।

লোহিত সাগরের উপকূলে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে

সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাতের পাশাপাশি ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলেও দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে সামরিক পরিস্থিতির। সাম্প্রতিক সময়ে ওই অঞ্চলে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তৃত হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার হুতিরা বন্দরনগরী মোখার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়। এর পরদিন বাব আল-মান্দেব প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ মায়ুন দ্বীপও তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এরপর সোমবার দক্ষিণ লোহিত সাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গ্রেটার হানিশ ও লেসার হানিশ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণও নেয় গোষ্ঠীটি।

ইয়েমেনের সরকার-সমর্থিত বাহিনী হানিশ দ্বীপপুঞ্জ থেকে সরে যাওয়ার পর দ্বীপ দুটি হুতিদের দখলে যায়। মোখা বন্দর ও মায়ুন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনাকে সরকারি বাহিনীর জন্য একটি ‘বেদনাদায়ক পরাজয়’ হিসেবে স্বীকার করেছেন ইয়েমেনের এক কর্মকর্তা।

তবে লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকায় আরও সেনা মোতায়েনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইয়েমেন সরকার।

বাব আল-মান্দেব প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। বিশ্বজুড়ে তেল ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনেও এই নৌপথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে এই এলাকায় হুতিদের নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারিত হওয়ায় লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সৌদির তেল অবকাঠামোয় হামলা, বন্ধ পাইপলাইন

ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি সৌদি আরবের ভূখণ্ডেও হুতিদের হামলা অব্যাহত রয়েছে। সৌদি জ্বালানি অবকাঠামো এবং লোহিত সাগরে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজে হামলার কারণে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও দামের ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে।

সৌদি আরবের রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে একাধিক ড্রোন হামলার পর নিরাপত্তার কারণে দেশটির পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহার করে সৌদি আরব ও প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে হামলা বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বাগদাদকে সতর্ক করেছে রিয়াদ।

সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালে এসব হামলা চালানো হয়। হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন বলেও জানানো হয়েছে।

শনিবার আরব নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার পরপরই পাইপলাইনের নিরাপত্তা যাচাই এবং এর অবস্থা পর্যালোচনার জন্য জরুরি ও বিশেষায়িত কারিগরি দল মোতায়েন করা হয়। সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন বন্ধ রাখা হয়েছে। পরিস্থিতিতে কোনো পরিবর্তন হলে তা জানানো হবে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুতিদের ধারাবাহিক হামলা, মক্কার কাছে ড্রোন ভূপাতিতের দাবি এবং ইয়েমেনে হুতিদের সামরিক তৎপরতা—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকায় জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।