শুক্রবার, 23 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

ইসরায়েলকে ঐতিহাসিক সহায়তা: ইহুদি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নাকি মার্কিন স্বার্থের বাস্তবায়ন?

ইসরায়েলকে দেওয়া আমেরিকার বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তর্কের শেষ নেই। সমালোচকদের মতে, এই অর্থ আমেরিকার সাধারণ মানুষের করের টাকার অপচয়। তবে সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে ভিন্নধর্মী এক বাস্তবতা—এই সহায়তা কেবল ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে না, বরং আমেরিকার জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনীতিতেও বিশাল অবদান রাখছে। সহজ ভাষায়, ইসরায়েলকে দেওয়া সাহায্য আমেরিকার জন্য একটি অত্যন্ত লাভজনক দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ।

ইসরায়েলকে ঐতিহাসিক সহায়তা: ইহুদি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নাকি মার্কিন স্বার্থের বাস্তবায়ন?
২০২৫ সালের ৭ই এপ্রিল, ওয়াশিংটন ডিসির হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে এক বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে করমর্দন করছেন। এএফপি সৌজন্যে গেটি ইমেজ

ইসরায়েলকে দেওয়া আমেরিকার বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তর্কের শেষ নেই। সমালোচকদের মতে, এই অর্থ আমেরিকার সাধারণ মানুষের করের টাকার অপচয়। তবে সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে ভিন্নধর্মী এক বাস্তবতা—এই সহায়তা কেবল ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে না, বরং আমেরিকার জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনীতিতেও বিশাল অবদান রাখছে। সহজ ভাষায়, ইসরায়েলকে দেওয়া সাহায্য আমেরিকার জন্য একটি অত্যন্ত লাভজনক দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ।

আমেরিকার প্রতিরক্ষা শিল্পের চাকা সচল রাখা

ইসরায়েলকে দেওয়া সামরিক সহায়তার একটি বড় অংশই খরচ হয় আমেরিকার নিজস্ব অস্ত্র নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে। মার্কিন আইন অনুযায়ী, এই অর্থের সিংহভাগ ব্যয় করতে হয় আমেরিকান অস্ত্র কিনতে। এর ফলে লকহিড মার্টিন (Lockheed Martin), বোয়িং (Boeing) এবং রেথিয়নের (Raytheon) মতো কোম্পানিগুলোতে হাজার হাজার কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়। এটি মূলত আমেরিকার টাকা আমেরিকার পকেটেই ফিরিয়ে আনার একটি প্রক্রিয়া।

যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তির ‘রিয়েল-টাইম’ পরীক্ষা

ইসরায়েল প্রতিনিয়ত আধুনিক সব ড্রোন, মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম এবং যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে। যুদ্ধক্ষেত্রে এই প্রযুক্তিগুলো কেমন কাজ করছে, তার সরাসরি তথ্য বা 'ডেটা' পায় আমেরিকা। উদাহরণস্বরূপ, ‘আয়রন ডোম’ (Iron Dome) বা ‘অ্যারো’ (Arrow) সিস্টেমের কার্যকারিতা দেখে আমেরিকা নিজের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পায়। কোনো আমেরিকান সৈন্যকে ঝুঁকিতে না ফেলেই যুদ্ধের ময়দানে নিজেদের অস্ত্রের কার্যকারিতা যাচাই করার এমন সুযোগ অন্য কোথাও নেই।

মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার একমাত্র বিশ্বস্ত ‘ফরোয়ার্ড বেস’

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল ভূ-রাজনীতিতে ইসরায়েল আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী ও গণতান্ত্রিক মিত্র। সেখানে বড় কোনো সামরিক ঘাঁটি স্থাপন ছাড়াই ইসরায়েলের মাধ্যমে আমেরিকা এই অঞ্চলে নিজের প্রভাব বজায় রাখে। ইসরায়েলের গোয়েন্দা তথ্য এবং সামরিক সক্ষমতা আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তাকে বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে ঢাল হিসেবে কাজ করে।

বিশ্লেষকদের দাবি ও বাস্তবতা

অনেকেই মনে করেন, এই অর্থ দিয়ে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো উন্নয়ন সম্ভব। কিন্তু প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল যদি এই সহায়তা না পেত, তবে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সামরিক ব্যয় বর্তমানের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে যেত।

নিবন্ধটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, "ইসরায়েলকে দেওয়া সহায়তা কেবল একটি পরোপকারী কাজ নয়, এটি আমেরিকার একটি কৌশলগত বিনিয়োগ যা আমাদের প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করে এবং মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের স্বার্থ রক্ষা করে।"

আরও বলা হয়েছে, "যারা ইসরায়েল বিরোধী মনোভাব থেকে এই সহায়তার বিরোধিতা করেন, তারা ভুলে যান যে এই অর্থের মাধ্যমে আমরা এমন সব সামরিক তথ্য ও উদ্ভাবন পাই যা অন্য কোনোভাবে কেনা সম্ভব নয়।"

আমেরিকার জন্য ইসরায়েল কেবল একটি মিত্র দেশই নয়, বরং একাধারে একটি বিশাল গবেষণাগার, একটি বিশাল অস্ত্রের বাজার এবং মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী পাহারাদার। তাই কাগজে-কলমে একে ‘সাহায্য’ বলা হলেও, দিনশেষে এটি ওয়াশিংটনের জন্য একটি বিশাল ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জয়। যারা এই সহায়তার বিরোধিতা করছেন, তারা আসলে মুদ্রার এক পিঠই দেখছেন।

আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সমীকরণে ইসরায়েলকে দেওয়া এই ফাণ্ডিং আসলে একটি ‘বিগ পে-অফ’ বা বড় প্রাপ্তি হিসেবেই গণ্য হচ্ছে।

সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক পোস্ট