সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের ৪৫ বছর পর আবারও সামনে এসেছে মামলাটি। সাক্ষ্য-প্রমাণের ঘাটতির কারণে ২০১১ সালে চট্টগ্রামের একটি আদালত মামলাটির কার্যক্রম শেষ ঘোষণা করেছিল। তবে দীর্ঘদিন পলাতক থাকা অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফর হোসেনকে গত জুলাইয়ে গ্রেপ্তারের পর নতুন করে মামলাটি সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা পরিকল্পনাকারী ও কুশীলবদের শনাক্ত করতেই মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকার পর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ১৫ জুলাই মধ্যরাতে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকা থেকে অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে কোর্ট মার্শালের জন্য তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এর আগের দিন ২৯ মে দুই দিনের সফরে চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন তিনি। সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল তার প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপির স্থানীয় নেতাদের মধ্যকার বিরোধ মীমাংসা করা।
চট্টগ্রামে পৌঁছানোর পর প্রথম দিন দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন জিয়াউর রহমান। রাতে তিনি ঘুমাতে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর সেনাবাহিনীর একটি দল সার্কিট হাউসে হামলা চালায় এবং তাকে গুলি করে হত্যা করে। পরদিন ৩০ মে সকালে রেডিওতে প্রথমবারের মতো তার নিহত হওয়ার খবর প্রচার করা হয়।
হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে মেজর মোজাফফর হোসেন ও ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিনের নাম বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও মামলাসংক্রান্ত বিবরণে উঠে এসেছে। এসব বিবরণ অনুযায়ী, মেজর মোজাফফর হোসেন প্রথমে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে শনাক্ত করেন এবং তাকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালান। পরে হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি চট্টগ্রাম সেনানিবাসে থাকা ২৪ পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে ফোন করে রাষ্ট্রপতি নিহত হওয়ার খবর দেন। তিনি বলেন, ‘The President has been killed.’
হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীর অভিযানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। এ সময় মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে মঞ্জুর নিহত হন। অন্যদিকে ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন গ্রেপ্তার হওয়ার পর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।
তবে মেজর মোজাফফর হোসেন ও মেজর এস এম খালেদ সে সময় পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে তারা পলাতক ছিলেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মেজর মোজাফফর হোসেন দীর্ঘ সময় ভারতে আত্মগোপনে ছিলেন। ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতে অবস্থান করেন। পরে ছদ্মনাম ব্যবহার করে সীমান্ত পার হয়ে বিভিন্ন এলাকায় চলাফেরা করতেন বলেও তদন্তে তথ্য পাওয়া যায়।
দীর্ঘ ৪৫ বছর আত্মগোপনে থাকার পর গত জুলাইয়ে ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হন মোজাফফর হোসেন। তার গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে দেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত অধ্যায়ে নতুন করে গতি এসেছে। একই সঙ্গে জিয়াউর রহমান হত্যার পেছনে কারা পরিকল্পনা করেছিলেন এবং নেপথ্যের কুশীলব কারা ছিলেন, তা খুঁজে বের করতে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।