যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানিকে ‘হামাসের সমর্থক’ আখ্যা দিয়ে তীব্র আক্রমণ করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে মামদানির কড়া সমালোচনার জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন।
সোমবার সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মামদানি নেতানিয়াহুকে ‘যুদ্ধাপরাধী এবং ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর ভয়াবহ গণহত্যার স্থপতি’ হিসেবে বর্ণনা করেন। এর জবাবে সংক্ষিপ্ত এক ভিডিওবার্তায় মামদানিকে আক্রমণ করেন নেতানিয়াহু।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বৃহস্পতিবার ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে নেতানিয়াহুর। এর আগেই শহরটির প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানির সঙ্গে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে মুখোমুখি হলেন তিনি।
মঙ্গলবার দেওয়া ভিডিওবার্তায় নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমি জাতিসংঘে যাচ্ছি। আমাদের বীর সেনাদের বিষয়ে আমি সত্য তুলে ধরব এবং তোমার (মামদানি) সম্পর্কেও সত্য বলব।’
এরপর মামদানির উদ্দেশে আরও কড়া ভাষায় নেতানিয়াহু বলেন, ‘লজ্জা হওয়া উচিত, মি. মামদানি। আমাদের মানুষদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হামাসের সন্ত্রাসী দানবদের সমর্থন করার জন্য তোমার লজ্জা হওয়া উচিত। নিউইয়র্কের ইহুদিদের বিরুদ্ধে দাঙ্গায় উসকানি দেওয়ার জন্যও তোমার লজ্জা হওয়া উচিত।’
দুই নেতার এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের পেছনে রয়েছে গাজা যুদ্ধ এবং ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে চলমান রাজনৈতিক বিতর্ক। এর আগে মামদানি বলেছিলেন, নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে প্রবেশ করলে তাকে গ্রেপ্তার করবেন। পরে অবশ্য তিনি স্বীকার করেন, বাস্তবে এমন গ্রেপ্তারের ক্ষমতা তার নেই।
মামদানির ফিলিস্তিনপন্থি অবস্থান এবং গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনার কারণে তার কিছু রিপাবলিকান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাকে ইহুদিবিদ্বেষী হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তবে মামদানি এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার বক্তব্য, তিনি ইহুদিবিদ্বেষের নিন্দা করেছেন এবং ইসরায়েল সরকারের নীতির সমালোচনাকে ইহুদি জনগণের প্রতি বিদ্বেষের সঙ্গে ভুলভাবে এক করে দেখা হচ্ছে।
মামদানিকে এর আগেও আক্রমণ করেছিলেন নেতানিয়াহু। জুলাই মাসে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিউইয়র্কের মেয়রের বিরুদ্ধে ‘বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার’ অভিযোগ তোলেন তিনি।
নেতানিয়াহু তখন বলেছিলেন, ‘তার দায়িত্ব সব নিউইয়র্কবাসীর মেয়র হওয়া—ইহুদি, খ্রিষ্টান, মুসলিম, সবাই। কিন্তু তিনি এক গোষ্ঠীকে অন্য গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন।’
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) মামলা চলছে। হেগভিত্তিক এই আদালত নেতানিয়াহু, তার সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং প্রয়াত হামাস নেতার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ এনেছে। নেতানিয়াহু এসব অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের প্রায় অর্ধেক নারী ও শিশু। অন্যদিকে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন, যাদের অধিকাংশই ছিলেন বেসামরিক নাগরিক।
যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্য নয়। ২০০০ সালে আদালত প্রতিষ্ঠার চুক্তি রোম সংবিধিতে যুক্তরাষ্ট্র স্বাক্ষর করলেও তা অনুমোদনের জন্য সিনেটে পাঠানো হয়নি। ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ওই চুক্তির প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে। ফলে আইসিসির সদস্য না হওয়ায় আদালতের রায় মানা বা এর জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার বাধ্যবাধকতা যুক্তরাষ্ট্রের নেই।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আইসিসির মামলার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। এর আগে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্তের জেরে আইসিসির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাসহ আদালতটির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিয়েছে তার প্রশাসন।
মঙ্গলবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণেও আইসিসির সমালোচনা করেন ট্রাম্প। আদালটিকে ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠান’ এবং ‘একদল দুষ্ট মানুষ’ দ্বারা পরিচালিত হিসেবে বর্ণনা করে এর সদস্য দেশগুলোকে সংস্থা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্য সব দেশকে এই উচ্ছৃঙ্খল প্রতিষ্ঠান থেকে অবিলম্বে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’
সূত্র: এনডিটিভি