শুক্রবার, 23 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

মোদির আমন্ত্রণে ভারতে আসা ইরানি জাহাজকে ডুবিয়ে দিয়ে কী বার্তা দিল যুক্তরাষ্ট্র

ভারত মহাসাগরে নিজেদের প্রভাব ও নিরাপত্তার দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তবে তার সেই ঘোষণার মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যেই ঘটেছে এক নাটকীয় ঘটনা—ভারতের আমন্ত্রণে মহড়ায় অংশ নেওয়া একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ আন্তর্জাতিক জলসীমায় হামলার শিকার হয়ে ডুবে গেছে।

মোদির আমন্ত্রণে ভারতে আসা ইরানি জাহাজকে ডুবিয়ে দিয়ে কী বার্তা দিল যুক্তরাষ্ট্র

ভারত মহাসাগরে নিজেদের প্রভাব ও নিরাপত্তার দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তবে তার সেই ঘোষণার মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যেই ঘটেছে এক নাটকীয় ঘটনা—ভারতের আমন্ত্রণে মহড়ায় অংশ নেওয়া একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ আন্তর্জাতিক জলসীমায় হামলার শিকার হয়ে ডুবে গেছে।

গত অক্টোবরের শেষ দিকে নৌবাহিনীর নীল ইউনিফর্ম ও রোদচশমা পরে ভারতীয় নৌসেনাদের এক অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেখানে তিনি ভারত মহাসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, এই মহাসাগর দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য ও জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিতদের ‘ভারত মাতা কি জয়’ স্লোগানের মধ্যে তিনি গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করেন, ‘ভারতীয় নৌবাহিনী হলো ভারত মহাসাগরের অভিভাবক।’

কিন্তু সেই ঘোষণার পাঁচ মাসের মধ্যেই দেখা গেল, ভারত মহাসাগরের কথিত ‘অভিভাবক’ নিজেই এক অতিথি জাহাজকে রক্ষা করতে পারেনি।

গত বুধবার ভারতের আমন্ত্রণে নৌ-মহড়ায় অংশ নেওয়া ইরানি যুদ্ধজাহাজ আইআরআইএস ডেনা দেশে ফেরার পথে হামলার মুখে পড়ে। শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূল থেকে মাত্র ৪৪ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ৮১ কিলোমিটার) দূরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি মার্কিন সাবমেরিনের টর্পেডো হামলায় জাহাজটি ডুবে যায়।

মহড়ার সময় ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু নিজেই জাহাজটির নাবিকদের সঙ্গে ছবি তুলেছিলেন। তবে জাহাজটি আক্রান্ত হওয়ার পর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে ভারতীয় নৌবাহিনীর এক দিনেরও বেশি সময় লেগেছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাত আরও বিস্তৃত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং এই হামলাকে সেই প্রস্তুতিরই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গত বুধবার পেন্টাগনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, “একটি মার্কিন সাবমেরিন ইরানি যুদ্ধজাহাজটি ডুবিয়েছে। তারা হয়তো ভেবেছিল, আন্তর্জাতিক জলসীমায় তারা নিরাপদ থাকবে।”

নিজ দেশের উপকূল থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে এমন হামলার ঘটনায় তেহরান তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ইরান বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে যে ‘আইআরআইএস ডেনা’ ছিল ভারতের আমন্ত্রিত ‘অতিথি’ এবং মহড়া শেষে ফেরার পথেই এটি হামলার শিকার হয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, “ইরানের উপকূল থেকে ২ হাজার মাইল (৩,২১৮ কিমি) দূরে সমুদ্রের বুকে যুক্তরাষ্ট্র ভয়াবহ নৃশংসতা চালিয়েছে। একদিন তাদের অবশ্যই এর জন্য পস্তাতে হবে।”

বর্তমানে আইআরআইএস ডেনা ভারত মহাসাগরের তলদেশে। জাহাজে থাকা ৮০ জনের বেশি ইরানি নাবিক নিহত হয়েছেন। মহড়ার সময় তারা ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে সেলফিও তুলেছিলেন।

ভারতের অবসরপ্রাপ্ত নৌ-কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মতে, শুধু একটি যুদ্ধজাহাজ নয়—ভারত মহাসাগরে নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভারতের যে ভাবমূর্তি ছিল, সেটিও বড় ধাক্কা খেয়েছে। ডেনার ওপর হামলা ভারতের সামুদ্রিক প্রভাব ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও সামনে এনেছে।


ভারতের নাকের ডগায় যুদ্ধ

‘মিলন’ নামের নৌ-মহড়া শেষ করে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বিশাখাপত্তনম বন্দর ত্যাগ করে ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডেনা। ৪ মার্চ ভোরে শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূলের কাছে আন্তর্জাতিক জলসীমায় প্রবেশের পরই জাহাজটি হামলার শিকার হয়।

উদ্ধার অভিযানে শ্রীলঙ্কা ৩২ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছে এবং ৮০ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে। আরও শতাধিক নাবিক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

মহড়ায় অংশ নেওয়া সাবেক নৌ-কর্মকর্তা ভাইস অ্যাডমিরাল শেখর সিনহা বলেন, “আমি নাবিকদের সঙ্গে দেখা করেছিলাম, তাদের খুব ভালো লেগেছিল। হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে আসা নাবিকদের কুচকাওয়াজ সত্যিই দেখার মতো।”

তিনি আরও বলেন, “একটি জাহাজ ডুবে যাওয়া সবসময় দুঃখজনক, তবে যুদ্ধের ময়দানে আবেগের স্থান নেই। আসলে যুদ্ধে নৈতিকতা বলতে কিছু নেই।”

শেখর সিনহার মতে, আগে ভারত মহাসাগরকে তুলনামূলক নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে ধরা হতো। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল বনাম ইরানের সংঘাত এখন ভারতের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে এবং মহাসাগরে ভারতের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।


ভারতের উভয়সংকট

জাহাজটি ডুবে যাওয়ার ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় পরে ভারতীয় নৌবাহিনী আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়।

তারা জানায়, বিপদ সংকেত পাওয়ার পর সাহায্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার আগেই শ্রীলঙ্কা উদ্ধার অভিযান শুরু করে। নয়াদিল্লি বা ভারতীয় নৌবাহিনী কেউই যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার সমালোচনা করেনি।

এতে বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—ভারত কি আগে থেকেই হামলার বিষয়ে অবগত ছিল, নাকি ছিল না?

ভারতের সাবেক নৌবাহিনীপ্রধান অ্যাডমিরাল অরুণ প্রকাশ বলেন, “ভারত যদি আগে না জানত, তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত অংশীদারিত্বের গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আর যদি জানত, তবে এটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে ভারতের অবস্থান প্রমাণ করে।”

অবসরপ্রাপ্ত নৌ-কর্মকর্তা এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সোসাইটি ফর পলিসি স্টাডিজ’-এর পরিচালক সি উদয় ভাস্কর বলেন, “সরকারের নীরবতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের নৈতিক অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এটি ভারতের জন্য কৌশলগত অস্বস্তি।”


‘আগ্রাসীদের পক্ষে ভারত'

দীর্ঘদিন ধরে ভারত নিজেকে ‘জোট নিরপেক্ষ’ রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরলেও বর্তমান সরকারের নীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতি ঝোঁক স্পষ্ট হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত।

ইরানে হামলার মাত্র দুদিন আগে নরেন্দ্র মোদি ইসরায়েল সফর করেন এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করেন।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর ভারত কোনো আনুষ্ঠানিক শোকবার্তাও দেয়নি। যেখানে সাধারণত মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন, সেখানে ভারত পাঠায় পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রকে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষক শ্রীনাথ রাঘবন মনে করেন, ভারত কার্যত আগ্রাসী শক্তিগুলোর পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে।

তিনি বলেন, “ভারত কেবল ইরানের পাল্টা হামলার সমালোচনা করছে, কিন্তু এর পেছনের কারণ এড়িয়ে যাচ্ছে। এটি মধ্যপ্রাচ্যে ভারতের গ্রহণযোগ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।”

এদিকে বিরোধী দল কংগ্রেসের সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে অভিযোগ করেছেন, মোদি সরকার ‘ভারতের কৌশলগত ও জাতীয় স্বার্থকে’ বিসর্জন দিয়েছে। তার মতে, সরকারের নীরবতা “ভারতের জাতীয় স্বার্থকে ক্ষুণ্ণ করছে এবং বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা পররাষ্ট্রনীতিকে ধ্বংস করছে।”