ক্লিন এনার্জি বা পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎপাদনে এক যুগান্তকারী রেকর্ড গড়েছে চীনের বিজ্ঞানীরা। কৃত্রিম সূর্য হিসেবে পরিচিত তাদের পরীক্ষামূলক পারমাণবিক চুল্লিতে প্লাজমার এমন উচ্চ ঘনত্ব তৈরি করা সম্ভব হয়েছে, যা এর আগে বিজ্ঞানের ইতিহাসে অসম্ভব বলে বিবেচিত হতো। ‘চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সেস’ (সিএএস)-এর গবেষকদের এই সাফল্য পারমাণবিক ফিউশন প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ব্যবহারের পথে থাকা অন্যতম প্রধান বাধা দূর করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নিউক্লিয়ার ফিউশন বা পারমাণবিক সংযোগ পদ্ধতিকে বিজ্ঞানীরা অসীম শক্তির ‘হলি গ্রেইল’ বা পরম কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য হিসেবে গণ্য করেন। কারণ এই প্রক্রিয়ায় কোনো বিপজ্জনক তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তৈরি না করেই অফুরন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। মহাকাশে সূর্য ঠিক যেভাবে প্রচণ্ড তাপ ও চাপে হাইড্রোজেন পরমাণু একত্রিত করে শক্তি উৎপন্ন করে, পৃথিবীতে ল্যাবরেটরির ভেতরে ঠিক সেই একই প্রক্রিয়া সফলভাবে দীর্ঘ সময় ধরে সচল রাখাই বিজ্ঞানীদের মূল চ্যালেঞ্জ।
গবেষণা প্রতিবেদনে জানা গেছে, চীনের এই ‘এক্সপেরিমেন্টাল অ্যাডভান্সড সুপারকন্ডাক্টিং টোকাম্যাক’ (ইস্ট) প্রকল্পটি এর আগে টানা এক হাজার সেকেন্ড চলার বিশ্ব রেকর্ড গড়েছিল। তবে প্লাজমার স্থিতিশীলতা রক্ষার ক্ষেত্রে ‘গ্রিনওয়াল্ড লিমিট’ নামক একটি তাত্ত্বিক সীমা বিজ্ঞানীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নতুন গবেষণায় ‘প্লাজমা-ওয়াল সেলফ অর্গানাইজেশন’ নামক একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গবেষকরা সেই প্রচলিত সীমা অতিক্রম করে প্লাজমাকে স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হয়েছেন। এর ফলে এখন আরও বেশি পরিমাণে শক্তি উৎপাদন এবং ‘ফিউশন ইগনিশন’ বা স্বয়ংক্রিয় শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়া অর্জন করা সহজ হবে।
গবেষক দলের অন্যতম সদস্য হুয়াজং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক পিং ঝু বলেন, “এ গবেষণার ফলাফল আমাদের টোকাম্যাক ও পরবর্তী প্রজন্মের বার্নিং প্লাজমা ফিউশন যন্ত্রগুলোর ঘনত্বের সীমা বাড়ানোর জন্য বাস্তবসম্মত ও সম্প্রসারণের পথ বাতলে দিচ্ছে।” এই গবেষণার পূর্ণাঙ্গ ফলাফল বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
যদিও বাণিজ্যিকভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে আরও কয়েক বছর সময়ের প্রয়োজন, তবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৩ সালে আমেরিকান কোম্পানি ‘হেলিয়ন এনার্জি’ ইতিহাসের প্রথম নিউক্লিয়ার ফিউশন শক্তি ক্রয় চুক্তি সই করেছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, ২০২৮ সালের মধ্যে তারা টেক জায়ান্ট মাইক্রোসফটকে ৫০ মেগাওয়াট ফিউশন শক্তি সরবরাহ করবে। চীনের এই নতুন উদ্ভাবন সেই বাণিজ্যিক যাত্রাকে আরও ত্বরান্বিত করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।