বঙ্গোপসাগরের জলসীমায় তেল ও গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেলে তা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হোসেন মাহমুদ।
তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, জ্বালানি খাতের টেকসই প্রসার ছাড়া কোনো দেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। আর তাই দেশের সর্বোচ্চ স্বার্থ রক্ষা করেই সমুদ্রে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের চূড়ান্ত চুক্তি সম্পাদন করা হবে।
রবিবার সচিবালয়ে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে নতুন দরপত্র আহ্বানের বিষয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় দেশের স্বার্থের বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ন না করে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সব কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এবারের দরপত্রে অংশ নিতে ইতিমধ্যে অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখিয়েছে এবং যোগাযোগ শুরু করেছে। ফলে এবারের প্রক্রিয়াটি বেশ প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক হবে।
গত বছরের দরপত্র প্রক্রিয়ায় কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সাড়া না পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব পালন করছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে এবং নিরাপত্তার আমেজে এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবেন। বর্তমান সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক মহলের ও বিনিয়োগকারীদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। এবার বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আকৃষ্ট করতে উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তি বা পিএসসি ২০২৬ সংশোধন করে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এবারের বিশেষ আকর্ষণ কী—এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী রসিকতা করে বলেন, এবারের মূল চমক হচ্ছে বিএনপি সরকার।
অতীতে বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানির কাজ মাঝপথে রেখে চলে যাওয়ার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি আগে থেকে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে দীর্ঘদিনের অচলবস্থা কাটিয়ে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের এই উদ্যোগ দেশের জ্বালানি খাতে একটি বড় সাফল্য। দেশের নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ মাটির নিচে ফেলে রেখে কেবল আমদানির ওপর নির্ভরশীল থাকার কারণে অতীতে রাষ্ট্রের বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর। সমুদ্র সীমানা জয় নিয়ে অতীতে অনেক প্রচার-প্রচারণা হলেও সমুদ্রের বুক থেকে খনিজ সম্পদ আহরণের বাস্তবমুখী কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অথচ প্রতিবেশী দেশগুলো ঠিকই সমুদ্র থেকে গ্যাস উত্তোলন করে নিজেদের কাজে লাগাচ্ছে। বিএনপি সরকার যখন শাসনভার গ্রহণ করে, তখন জ্বালানি খাতের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক ছিল। বর্তমান সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় সেই পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, প্রথাগত জ্বালানির পাশাপাশি নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর সরকার বিশেষ জোর দিচ্ছে। আজ দেশের জ্বালানি খাতের জন্য একটি অত্যন্ত আনন্দের দিন, কারণ দেশের ছয়টি প্রধান জাতীয় দৈনিকের মাধ্যমে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের আন্তর্জাতিক দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। একই সাথে এই বিজ্ঞপ্তি বিভিন্ন দেশের দূতাবাসেও পাঠানো হয়েছে। পূর্ববর্তী দরপত্রের সমস্ত ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা দূর করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ শতভাগ সুরক্ষিত রেখেই এই খাতের বিদ্যমান ঝুঁকিগুলো দূর করা হবে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বিগত সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, গত বছর বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র সংগ্রহ করলেও শেষ পর্যন্ত কেউ তা জমা দেয়নি। পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ থেকে কমিটি গঠন করে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর মতামত নেওয়া হয় এবং বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় দীর্ঘ এক বছর চুলচেরা বিশ্লেষণ ও গবেষণা শেষে পিএসসি সংশোধন করে যুগোপযোগী করা হয়েছে, যা এবার বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করবে।