শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের সঙ্গে ৪০ কোটি ডলারের আর্থিক সমঝোতায় রাজি হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটক। শিশুদের গোপনীয়তা রক্ষার আইন ভঙ্গের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রে এটি অন্যতম বড় অঙ্কের সমঝোতা।
২০২৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সময়ে মার্কিন বিচার বিভাগ টিকটক ও এর মূল প্রতিষ্ঠান বাইটড্যান্সের বিরুদ্ধে মামলাটি করে। অভিযোগে বলা হয়, ১৩ বছরের কম বয়সী লাখ লাখ শিশুর কাছ থেকে প্ল্যাটফর্মটি বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করেছে।
মার্কিন আইনে ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের আগে অভিভাবকের সম্মতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। ২০০০ সালে প্রণীত চিলড্রেনস প্রাইভেসি প্রটেকশন অ্যাক্টে এ বিধান রয়েছে। একই আইনের আওতায় বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্য মেটার বিরুদ্ধেও মামলা করছে।
মার্কিন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ব্রেট শুমেট বলেছেন, "এই মামলা শুরু হওয়ার সময়ের তুলনায় এখন শিশু ও অভিভাবকেরা আরও ভালোভাবে সুরক্ষিত।"
শিশুদের গোপনীয়তা সংক্রান্ত একই আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে এর আগে আরও কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে বড় অঙ্কের জরিমানা দিতে হয়েছে। ২০১৯ সালে ইউটিউবকে ১৭ কোটি ডলার এবং ২০২২ সালে এপিক গেমসকে ২৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার জরিমানা দিতে হয়েছিল।
এদিকে একই আইনের আওতায় মেটার বিরুদ্ধে ২৯টি মার্কিন অঙ্গরাজ্য মামলা করেছে। এসব মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, শিশুদের লক্ষ্য করে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হয়েছে মেটা।
টিকটকের যুক্তরাষ্ট্রের কার্যক্রমকে বাইটড্যান্সের চীনা কার্যক্রম থেকে আলাদা করার প্রক্রিয়া গত বছর শুরু হলেও বর্তমান সমঝোতাটি মূলত চীনে পরিচালিত টিকটকের কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বাইটড্যান্সের সর্বশেষ বিনিয়োগ মূল্যায়ন অনুযায়ী, কোম্পানিটির বাজারমূল্য প্রায় ৫৫০ বিলিয়ন ডলার।
সমঝোতার শর্ত অনুযায়ী, টিকটক ও বাইটড্যান্স তাৎক্ষণিকভাবে মার্কিন বিচার বিভাগকে ৩০ কোটি ডলার পরিশোধ করবে। এরপর ২০১৯ সালে মার্কিন ফেডারেল ট্রেড কমিশনের সঙ্গে করা একটি আইনি সমঝোতা বাতিলের পর তাদের আরও ১০ কোটি ডলার দিতে হবে।
২০১৯ সালের ওই সমঝোতায় বাইটড্যান্সের পূর্বসূরি প্রতিষ্ঠান মিউজিক্যালিকে শিশুদের গোপনীয়তা রক্ষার আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ৫৭ লাখ ডলার জরিমানা করা হয়েছিল। একই সঙ্গে ১৩ বছরের কম বয়সী কোনো ব্যবহারকারী অ্যাপটি ব্যবহার করতে চাইলে তার বাবা-মায়ের সম্মতি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
শুক্রবারের ঘোষণায় মার্কিন বিচার বিভাগ জরিমানার বাইরে টিকটকের বিরুদ্ধে নতুন কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানায়নি। তবে বিচার বিভাগ জানিয়েছে, মামলা হওয়ার পর টিকটকের কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।
এসব পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে কোম্পানিটির মালিকানা কাঠামো, ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা সুরক্ষার নীতি এবং তরুণ ব্যবহারকারীদের জন্য প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন।
মামলা দায়েরের সময় মার্কিন সরকারের আইনজীবীরা জানিয়েছিলেন, টিকটকে ১৭ কোটির বেশি কিশোর ব্যবহারকারী ছিল। অ্যাপটি শিশুদের মধ্যেও ব্যাপক জনপ্রিয় এবং তাদের লক্ষ্য করেই পরিচালিত হচ্ছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছিল।
অভিযোগের আরেকটি দিক ছিল, টিকটকে ব্যবহারকারীদের বয়স যথাযথভাবে যাচাই করা হতো না। ফলে ১৩ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অভিভাবকের সম্মতিও নেওয়া হয়নি।
২০২৪ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন টিকটক নিষিদ্ধ করা অথবা যুক্তরাষ্ট্রে বাইটড্যান্সের কাছ থেকে এর ব্যবসা আলাদা করার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও টিকটকের মার্কিন কার্যক্রমকে বাইটড্যান্স থেকে পৃথক করার পক্ষে অবস্থান নেন।
গত বছর সেই মালিকানা পরিবর্তন কার্যকর হয়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে টিকটকের ব্যবসার ৮১ শতাংশের মালিকানা একটি বিনিয়োগকারী জোটের হাতে রয়েছে। বাইটড্যান্সের মালিকানা রয়েছে বাকি ১৯ শতাংশ।