শনিবার, 7 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

উজানের ঢলে বাড়ছে নদীর পানি, বন্যার শঙ্কায় হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজার

টানা বর্ষণ ও ভারতের ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতোমধ্যে দুই জেলার একাধিক নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় নিম্নাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিশেষ উদ্বেগ তৈরি হয়েছে হবিগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধসংলগ্ন খোয়াই নদীকে ঘিরে।

উজানের ঢলে বাড়ছে নদীর পানি, বন্যার শঙ্কায় হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজার

টানা বর্ষণ ও ভারতের ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতোমধ্যে দুই জেলার একাধিক নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় নিম্নাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিশেষ উদ্বেগ তৈরি হয়েছে হবিগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধসংলগ্ন খোয়াই নদীকে ঘিরে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, দুই জেলার ছয়টি নদীর মোট নয়টি পর্যবেক্ষণ পয়েন্টে পানি বর্তমানে বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে।


হবিগঞ্জে চার নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে

হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইদুর রহমান জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার তথ্য অনুযায়ী, খোয়াই নদীর পানি বাল্লা স্টেশনে বিপৎসীমার ২২০ সেন্টিমিটার, শায়েস্তাগঞ্জে ৯৯ সেন্টিমিটার এবং মাধবপুরের হরিপুর পয়েন্টে ১৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

তিনি জানান, কুশিয়ারা নদীর পানি শেওলারবাজার পয়েন্টে বিপৎসীমার ৩১ সেন্টিমিটার নিচে থাকলেও তা ক্রমাগত বাড়ছে। অন্যদিকে মারকুলি পয়েন্টে নদীটির পানি বিপৎসীমার ১১ সেন্টিমিটার অতিক্রম করেছে। এছাড়া আজমিরীগঞ্জে কালনী-কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ৬১ সেন্টিমিটার এবং শায়েস্তাগঞ্জের সুতাং সেতু এলাকায় সুতাং নদীর পানি ২৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

তবে মাধবপুরের মনতলা পয়েন্টে সোনাই নদীর পানি বিপৎসীমার ১৯৮ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে এবং তা কমতির দিকে রয়েছে বলে জানান তিনি।

গত ২৪ ঘণ্টায় হবিগঞ্জে ৬১ দশমিক ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

মো. সাইদুর রহমান বলেন, হাওরগুলো প্রায় সর্বোচ্চ পানি ধারণক্ষমতায় পৌঁছে গেছে। ফলে নতুন করে আসা পানি ধীরগতিতে নিষ্কাশিত হচ্ছে এবং খোয়াই নদীর ওপর চাপ আরও বাড়ছে। এতে নদীর দুই তীরের জনবসতি বন্যার ঝুঁকিতে পড়েছে।

হবিগঞ্জ শহরের মাছুলিয়া এলাকার বাসিন্দা সাদেক হোসেন বলেন, ‘খোয়াই নদীর বাঁধ অনেক জায়গায় দুর্বল। এ কারণে আমরা সব সময় আতঙ্কের মধ্যে থাকি।’


মৌলভীবাজারে মনু ও ধলাই নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়েছে

মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ জানান, টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে জেলার অধিকাংশ নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। জেলার পাঁচটি পর্যবেক্ষণ পয়েন্টের মধ্যে তিনটিতে পানি বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে, আর বাকি দুটি পয়েন্টে এখনও নিচে থাকলেও সেখানেও পানি দ্রুত বাড়ছে।

সকাল ৯টার তথ্য অনুযায়ী, মনু নদীর পানি রেলওয়ে ব্রিজ ও চাঁদনীঘাট—দুই পয়েন্টেই বিপৎসীমার ৫৫ সেন্টিমিটার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সময়ে রেলওয়ে ব্রিজ পয়েন্টে ধলাই নদীর পানি বিপৎসীমার ৩৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

অন্যদিকে, শেরপুর পয়েন্টে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ৩১ সেন্টিমিটার নিচে থাকলেও তা ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।

খালেদ বিন অলীদ বলেন, মনু ও ধলাই নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। কুশিয়ারা ও জুড়ী নদীর পানিও দ্রুত বাড়ছে। এতে নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের পর্যবেক্ষক আনিসুর রহমান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ৯৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত হয়েছিল ৯১ মিলিমিটার।

বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতি, দুশ্চিন্তায় গ্রামবাসী

মৌলভীবাজারের ছনগাঁও গ্রামের বাসিন্দা শ্যামসুন্দর বিশ্বাস বলেন, ‘পানি এত দ্রুত বাড়বে, তা কখনও ভাবিনি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমাদের উঠান ও আশপাশের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে।’

মাঝেরগাঁও গ্রামের কৃষক সাদ্দাম হোসেন জানান, আকস্মিক বন্যায় তার সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, ‘কৃষিই আমাদের একমাত্র জীবিকা। সরকারি সহায়তা ছাড়া এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।’

কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদাল হোসেন জানান, আকস্মিক বন্যায় ইউনিয়নের অন্তত ১২০ থেকে ১৫০টি পরিবারের উঠান ও আশপাশের এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পাশাপাশি কৃষিজমিরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।

অবৈধ বালু উত্তোলনে বাড়ছে ঝুঁকি

খোয়াই রিভার ওয়াটারকিপার তোফাজ্জল সোহেল বলেন, ভারি বৃষ্টিপাত বন্যার একটি প্রাকৃতিক কারণ হলেও মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।

তিনি বলেন, খোয়াই নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীতীরের বিভিন্ন অংশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। অপরিকল্পিত দখল ও বাঁধের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবও নদীর বন্যা প্রতিরোধব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করেছে।

জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে বাঁধ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই নদী ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।