আর্কাইভ
ads
logo

নোবিপ্রবির তিন প্রতিবাদী শিক্ষক, আজ দেশের তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশকাল: ১ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৫৮ পি.এম
নোবিপ্রবির তিন প্রতিবাদী শিক্ষক, আজ দেশের তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে

ads

দুই বছর আগে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে যে ছোট্ট প্রতিবাদী সমাবেশ হয়েছিল, আজ তা অনেকের কাছে ইতিহাসের একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, গ্রেপ্তার ও প্রাণহানির ঘটনায় যখন অধিকাংশ শিক্ষক নীরব ছিলেন, তখন মাত্র তিনজন শিক্ষক প্রকাশ্যে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। দুই বছর পর সেই তিন শিক্ষকই এখন দেশের তিনটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে রয়েছেন।

এই তিন শিক্ষক হলেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হানিফ মুরাদ, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম এবং অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর সরকার। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে নোবিপ্রবির শহীদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁরা শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান।

সেই সময় দেশে আন্দোলন ঘিরে একের পর এক সহিংস ঘটনার খবর আসছিল। বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, গ্রেপ্তার ও প্রাণহানির ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছিল। প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত ঝুঁকির আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও এই তিন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের মতে, এটি ছিল একজন শিক্ষকের নৈতিক দায়িত্ব।

বর্তমানে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হানিফ মুরাদ লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছেন। আন্দোলনের পর তিনি প্রথমে নোবিপ্রবির ট্রেজারার হিসেবে নিয়োগ পান। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম নোবিপ্রবির উপ-উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আর অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর সরকার সম্প্রতি সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য হিসেবে যোগ দিয়েছেন।

সেই সময়ের স্মৃতি তুলে ধরে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হানিফ মুরাদ বলেন, “ঐসময় শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমে গিয়েছিল , এক পর্যায়ে তারা সব শিক্ষকদের মেইল করে অনুরোধ করে ওদের সাথে থাকার জন্য। আমরাও আগে থেকে প্রিপারেশন নিচ্ছিলাম এরপর ওদের মেইল পেয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নেই আমরাও ওদের সাথে গিয়ে আন্দোলনে একাত্মতা পোষণ করবো। বিশেষ করে আমি, জাহাঙ্গীর স্যার, শফিক স্যার আলোচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেই।”

তিনি আরও বলেন, “তখন আমরা কোনো কিছু পাওয়ার প্রত্যাশায় আন্দোলনে নামিনি। আমার অনুভূতি ছিলো আমরা তো শিক্ষক আমাদের ছাত্রদের উপর নির্মম অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়।”

তিনি বলেন, “একজন শিক্ষক হিসেবে ক্লাসে থাকা যতটা ইম্পর্ট্যান্ট, যৌক্তিক আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা মারা যাচ্ছে তখন তাদের পাশে থাকা আরো বেশি ইম্পর্ট্যান্ট। এতে আমরা চাকরিচ্যুত হওয়া, এরেস্ট হওয়া এবং মেরেও ফেলতে পারতো এগুলো নিয়ে চিন্তা না করে আন্দোলনে ছাত্রদের পাশে দাড়াই।”

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা শহিদ মিনারের সামনে দাড়িয়েছি যখন দেখেছি আমাদের ছাত্রদের দাবি ন্যায্য, তারা যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলন করছিলো তখন তাদের উপর গুলি ছোড়া হচ্ছিলো, তাদের উপর নির্মম নির্যাতন চালানো হচ্ছিলো। বিশেষ করে আবু সাঈদকে যখন গুলি করে হত্যা করা হয় তখন আমরা ছাত্রদের আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করি। ঐসময় এই চিন্তা করিনি আমাদের চাকরি চলে যাবে আমাদের ক্ষতি হবে বা এরকম কিছু।”

তিনি আরও জানান, “আমরা দীর্ঘ ১৭ বছর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন যৌক্তিক আন্দোলনে রাজপথে ছিলাম। আমাদের ১৯৭১ এ জন্ম হয়নি দেখে আমরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারিনি, আমার জীবদ্দশায় ভবিষ্যতে আবার যদি কখনো দাড়াতে হয় দেশের জন্য আবারো দাড়াবো, ইনশাআল্লাহ।”

অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর সরকার বলেন, “আমি আন্দোলন করেছি একটি বৈষম্যবিরোধী সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠুক, প্রত্যেকে প্রত্যেকের অধিকার ফিরে পাক। এর জন্য যে আমাকে কিছু পেতে হবে তাই আন্দোলন করিনি। ছাত্র সমাজের উপর হামলা, সারাদেশে গুম, খুন, হত্যা এর প্রতিবাদে ঐ সময় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়েছি।”

তিনি আরও বলেন, “আমি একটি বিষয় ধারণ করি; আজকের ছাত্র আগামীর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। এজন্য আমার দায়িত্বের জায়গা থেকে যতটুকু করার আমি করি। দায়িত্ব পেয়েছি এজন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া, সরকারকেও ধন্যবাদ। দায়িত্ব পাওয়াই বড় কথা নয় এই দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করতে পারাই মূল বিষয়।”

দুই বছরের ব্যবধানে নোবিপ্রবির শহীদ মিনারের সেই প্রতিবাদী সমাবেশ এখন শুধু একটি স্মৃতি নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতার নৈতিক অবস্থান ও সামাজিক দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনারও উপলক্ষ হয়ে উঠেছে। সেই সমাবেশে অংশ নেওয়া তিন শিক্ষক আজ তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বের অংশ—যা অনেকের কাছে ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়েও বড় একটি প্রতীকী ঘটনা।


ads

এই বিভাগের আরও খবর

এই বিভাগের আরও খবর

ads
ads
manusherkotha

manusherkotha

সর্বশেষ খবর

হাইলাইটস

বিশেষ সংবাদ