সংবিধান সংস্কার নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের নির্ধারিত প্রক্রিয়া থেকে সরে এসে নির্বাচিত বিএনপি সরকার নিজস্ব উদ্যোগে সংশোধন কার্যক্রম শুরু করেছে। বিরোধী দলের আপত্তি উপেক্ষা করে জাতীয় সংসদে গঠন করা হয়েছে ‘সংবিধান সংশোধন–সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’, যা আগামীকাল মঙ্গলবার প্রথম বৈঠকে বসছে।
এতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে—জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত ৪৮টি সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবের ভবিষ্যৎ কী, বিশেষ কমিটি কীভাবে কাজ করবে এবং কবে নাগাদ সংসদে তাদের প্রতিবেদন দাখিল করবে।
গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের এ বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। সংসদের জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কমিটির দায়িত্ব হলো ‘সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনের নিমিত্ত সুপারিশ প্রণয়নপূর্বক সংসদে রিপোর্ট পেশ’। তবে কমিটির কার্যপদ্ধতি, আলোচনার ধরন কিংবা কাজের সময়সীমা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ হয়নি। জানা গেছে, প্রথম বৈঠকেই এসব বিষয়ে কর্মকৌশল চূড়ান্ত করা হবে।
সরকারি দল বিরোধী দলের কাছ থেকে পাঁচজন সদস্যের নাম চাইলেও তারা কোনো নাম দেয়নি। কমিটি গঠনের দিনই বিরোধী দল সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে এবং কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করে। সেদিন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, “এ ধরনের কমিটি গঠনের বিষয়ে তাঁদের ধারণাগত মতপার্থক্য আছে। তাঁরা সংবিধান সংস্কার চান।”
সংবিধান সংস্কারের আলোচনা শুরু হয়েছিল অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। ২০২৪ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়, যার একটি ছিল অধ্যাপক আলী রীয়াজের নেতৃত্বাধীন সংবিধান সংস্কার কমিশন। বিভিন্ন অংশীজনের মতামত, জনমত জরিপ ও পরামর্শের ভিত্তিতে কমিশন ২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি বিস্তারিত সুপারিশ সরকারের কাছে জমা দেয়। পরে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দুই দফা দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে তৈরি হয় জুলাই জাতীয় সনদ।
জুলাই সনদের ৪৮টি প্রস্তাব সরাসরি সংবিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে রয়েছে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন, উচ্চকক্ষের ক্ষমতা নির্ধারণ, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের পদ্ধতি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া এবং প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধানসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসব বাস্তবায়িত হলে সংবিধানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে কয়েকটি বিষয়ে বিএনপির ভিন্নমত ছিল। দলটি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছিল, নিম্নকক্ষে কোনো দল যে সংখ্যক আসন পাবে, তার ভিত্তিতে উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন হবে। অন্যদিকে জুলাই সনদে বলা হয়েছিল, সারা দেশে পাওয়া মোট ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন করতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছরের নভেম্বরে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হয়। সেই আদেশের ভিত্তিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিএনপির ভিন্নমতের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল না; মূল ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবগুলোর ওপরই ভোট নেওয়া হয়। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হওয়ায় নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন এবং সদস্যদের দুটি শপথ নেওয়ার বিধান ছিল—একটি সংসদ সদস্য হিসেবে, অন্যটি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে।
জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতৃত্বাধীন জোটের নির্বাচিত সদস্যরা দ্বিতীয় শপথ নিলেও বিএনপির সংসদ সদস্যরা তা নেননি। ফলে সংস্কার পরিষদ গঠন হয়নি। বিএনপির দাবি, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অবৈধ এবং এ ধরনের শপথ নেওয়ার সাংবিধানিক সুযোগ নেই। তবে দলটি বলেছে, তারা জুলাই সনদ যেভাবে স্বাক্ষর করেছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়ন করবে।
নতুন গঠিত বিশেষ কমিটি অংশীজনদের সঙ্গে আবারও সংবিধান সংশোধন নিয়ে আলোচনা করবে। পাশাপাশি বিদ্যমান সংবিধান, জুলাই সনদের প্রস্তাব এবং বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে থাকা সংশোধনী বিষয়গুলো পর্যালোচনা করবে।
কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, প্রথম বৈঠকে কমিটি নিজেদের কর্মকৌশল নির্ধারণ করবে। তাঁর ভাষায়, “জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিএনপির অঙ্গীকার আছে। এর বাইরেও বিএনপির নিজস্ব কিছু অঙ্গীকার আছে।” তিনি জানান, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, গণমাধ্যমের সম্পাদকসহ বিভিন্ন স্তরের অংশীজনের মতামত নেওয়া হবে। পরে কমিটি সংসদে প্রতিবেদন দেবে এবং সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইন মন্ত্রণালয় সংশোধনী বিল উত্থাপন করবে। বিলটি নিয়ে সংসদে আলোচনা শেষে ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হবে।
এখন মূল প্রশ্ন হলো—বিশেষ কমিটি কি জুলাই সনদের ৪৮টি সাংবিধানিক প্রস্তাব বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই কাজ করবে, নাকি সেগুলোকে কেবল বিবেচনায় রেখে বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারের আলোকে নতুন করে সংশোধনী সুপারিশ তৈরি করবে। বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছিল, ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর যে আঙ্গিকে জুলাই জাতীয় সনদ ঐকমত্যের ভিত্তিতে স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তা বাস্তবায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।







