ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আসাম রাজ্যে ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার প্রশাসন। এ অভিযানে ১ হাজার ১০০টিরও বেশি মুসলিম পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। একই সঙ্গে কয়েকটি মসজিদও ভেঙে ফেলার অভিযোগ উঠেছে।
গত রোববার আসামের নগাঁও জেলার লুতুমারি লংজাপ সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ৬০০টিরও বেশি মুসলিম পরিবারের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এর আগের দিন রাজ্যটির আরও তিন জেলায় পাঁচ শতাধিক পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে উচ্ছেদের শিকার হয়েছে ১ হাজার ১০০টির বেশি মুসলিম পরিবার।
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই অভিযানকে রাজ্যের উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে সংখ্যালঘু সংগঠনগুলো সরকারের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ করেছে। তাদের দাবি, উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর অধিকাংশই বাংলাভাষী মুসলিম।
গত শনি ও রোববার নগাঁও, হোজাই ও গোলাঘাট জেলায় বন বিভাগের উদ্যোগে মূল উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়। এর মধ্যে রোববার নগাঁও জেলার লুতুমারি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে সবচেয়ে বড় অভিযান চালানো হয়। এক দিনেই সেখানে প্রায় ৩১৪ হেক্টর জমি দখলমুক্ত করা হয়। এ ঘটনায় প্রায় ৫৫০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
লুতুমারি এলাকার বাসিন্দারা কয়েক দশক ধরে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ৩০০ হেক্টরেরও বেশি জমিতে বসবাস করে আসছিলেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দাবি, তাঁরা অবৈধভাবে জমি দখল করে বসবাস করছিলেন না। বরং সরকারই তাঁদের ওই এলাকায় পুনর্বাসিত করেছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন পোস্টে দাবি করা হয়েছে, ১ হাজার ১০০টির বেশি পরিবারকে উচ্ছেদের পাশাপাশি অভিযানে বেশ কয়েকটি মসজিদও ভেঙে ফেলা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন এ অভিযান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
অল আসাম মাইনরিটিজ স্টুডেন্টস ইউনিয়ন উচ্ছেদ কার্যক্রমে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছে। সংগঠনটির দাবি, গত রোববারের অভিযানে সহস্রাধিক বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি একাধিক মসজিদও ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
সংগঠনটির সভাপতি জানিয়েছেন, লুতুমারি বনাঞ্চল থেকে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর একটি বড় অংশকে ১৯৭৩ সালে সরকার সাময়িকভাবে সেখানে পুনর্বাসিত করেছিল।
সংগঠনটির অভিযোগ, আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও উচ্ছেদ কার্যক্রমে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। অথচ অন্য ধর্মাবলম্বী বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে এখনো নোটিশ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।
এর আগে গত জুনে অল ইন্ডিয়া ইউনিয়ন অব ফরেস্ট ওয়ার্কিং পিপলস আসাম সরকারকে লুতুমারি লংজাপ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গ্রামবাসীদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিল।
সংগঠনটির যুক্তি, ওই এলাকার চারটি গ্রামের বাসিন্দাদের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে চালু হওয়া ‘টংগিয়া’ বন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির আওতায় বসতি গড়ে দেওয়া হয়েছিল। এ কারণে তাঁদের সাধারণ বনভূমি দখলকারী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয় বলে মনে করে সংগঠনটি।
টংগিয়া পদ্ধতিতে বনাঞ্চলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী বন বিভাগের অধীনে কাজ করার পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে মূল্যবান গাছের সঙ্গে খাদ্যশস্যও চাষ করত। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশরা এ পদ্ধতি চালু করে। পরবর্তী সময়ে আসামের কয়েকটি এলাকাতেও এই ব্যবস্থা চালু করা হয়।