জার্মানির ৩০টির বেশি শহরে আগামীকাল শনিবার বিক্ষোভে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তরুণেরা। শিক্ষা, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং সামরিক খাতে সরকারের ব্যয় বাড়ানোর প্রতিবাদে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। জেন-জি প্রজন্মের উদ্যোগে আয়োজিত এই বিক্ষোভের প্রতি অনেকে সমর্থন জানালেও দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ছাত্রসংগঠনগুলো এতে যুক্ত হচ্ছে না।
ফ্রান্সসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এ কারণে জার্মানিতেও আগামীকালের কর্মসূচি ঘিরে একই ধরনের পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য সহিংসতা বিবেচনায় বিভিন্ন শহরের কর্তৃপক্ষ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
গত কয়েক সপ্তাহে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ধারাবাহিক বিক্ষোভ হয়েছে। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল ও আলবেনিয়ায় হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমেছেন। এসব আন্দোলনে কোথাও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কোথাও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন, আবার কোথাও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছিল মূল দাবি। তবে কয়েকটি দেশে বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেয়। এ সময় দোকানপাটে লুটপাট, ব্যারিকেডে আগুন দেওয়া এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে।
জার্মানিতে এবারের আন্দোলনের সংগঠক কারা, তা এখনো পরিষ্কার নয়। ‘জেন-জি’ নামের একটি উদ্যোগ থেকে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হলেও এর পেছনে কারা রয়েছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। আয়োজকদের ওয়েবসাইটে দেওয়া যোগাযোগের ঠিকানাও গত এক সপ্তাহে দুইবার পরিবর্তন করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সেখানে সুইজারল্যান্ডের একটি ঠিকানা উল্লেখ করা হয়।
টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ও টেলিগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দেশজুড়ে ও স্থানীয় পর্যায়ে বিক্ষোভের প্রচার চালানো হচ্ছে।
জার্মানির এআরডি টেলিভিশনের অনলাইন সংবাদে বলা হয়েছে, আন্দোলনকারীদের সাংগঠনিক কাঠামো স্পষ্ট না হওয়ায় দেশটির ফেডারেল ছাত্রপ্রতিনিধি সংগঠন ‘বুন্দেশ সুলার কনফারেন্স’ প্রস্তাবিত বিক্ষোভ থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে। তবে আগামী ২০ নভেম্বর বার্লিনে সংগঠনটি নিজস্ব উদ্যোগে আলাদা একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা করছে। এতে শিক্ষক এবং অন্যান্য যুব আন্দোলনের প্রতিনিধিদেরও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
বার্লিনের ফ্রাই ইউনিভার্সিটির আন্তবিষয়ক শান্তি ও সংঘাত গবেষণাকেন্দ্রের গবেষক ইয়ানিস ইউলিয়ান গ্রিম মনে করেন, নতুন কোনো প্রতিবাদ আন্দোলনের ক্ষেত্রে শিথিল সাংগঠনিক কাঠামো অস্বাভাবিক নয়। তাঁর ভাষায়, ‘বিশেষ করে আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক এবং ডিজিটাল যোগাযোগমাধ্যমের ভিত্তিতেই বিক্ষোভের সূচনা হয়। সুস্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন, নির্দিষ্ট মুখপাত্র ও পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক কর্মসূচিসহ একটি সুসংগঠিত কাঠামো তৈরি হতে অনেক সময় লাগে।’ এ প্রসঙ্গে তিনি ‘ফ্রাইডে ফর ফিউচার’ আন্দোলনের উদাহরণ দেন।
আগামীকালের বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের ওয়েবসাইটে ছয়টি দাবি তুলে ধরেছেন। প্রথম দাবিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদকাসক্তি নিরাময় সহায়তা এবং মনোচিকিৎসার জন্য বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এসব খাতে বাজেট কমানো যাবে না বলেও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
দ্বিতীয় দাবিতে সবার জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখার কথা বলা হয়েছে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সংকট ও উদ্বেগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। তৃতীয় দাবিতে তরুণ প্রজন্মের ওপর সাশ্রয়ের বোঝা না চাপিয়ে সমাজের সব শ্রেণির মধ্যে ব্যয়ের দায়িত্ব ন্যায্যভাবে বণ্টনের কথা বলা হয়েছে।
চতুর্থ দাবিতে সামরিক খাতে ব্যয় কমানো এবং ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার পর বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণে নিয়োগের বিরোধিতা করা হয়েছে। তরুণদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাঁদের মতামত না নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। পঞ্চম দাবিতে মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় নজরদারি ব্যবস্থা ক্রমাগত সম্প্রসারণ বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে। আর ষষ্ঠ দাবিতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর জলবায়ু সুরক্ষাব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তোলা হয়েছে।
বিক্ষোভ প্রসঙ্গে গবেষক গ্রিম আরও বলেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক অসহায়ত্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার অভিন্ন অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, গত কয়েক বছরে সামাজিক বৈষম্য বেড়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অনেক দেশের শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে সংকটে রয়েছে। পাশাপাশি জলবায়ু সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সবচেয়ে বেশি বহন করতে হবে তরুণ প্রজন্মকেই।
জার্মানির পরিবেশবাদী দল গ্রিন পার্টির সভাপতি ফেলিক্স বানাসাকও আন্দোলনকারীদের সবাইকে সন্দেহের চোখে না দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। দেশটির সংবাদমাধ্যম নেটওয়ার্ক আরএনডিকে তিনি বলেন, আগেভাগেই বিক্ষোভকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা এবং আন্দোলনকারীদের সহিংস গোষ্ঠীর সঙ্গে এক করে দেখার প্রবণতা কিছু মানুষকে আরও উগ্রপন্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাঁর মতে, এর পরিবর্তে তরুণদের ন্যায্য দাবিগুলো নিয়ে গঠনমূলক রাজনৈতিক আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
তবে সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত নয় জার্মানির নিরাপত্তাবিষয়ক কর্তৃপক্ষ। যদিও তাদের বক্তব্যে এখন পর্যন্ত বিশেষ উদ্বেগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, বিক্ষোভে সহিংসতার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো আহ্বান এখন পর্যন্ত তাঁদের নজরে আসেনি। তবে বামপন্থী চরমপন্থী গোষ্ঠীর কিছু অংশ এবং বিদেশের কয়েকটি সংগঠন বিক্ষোভের আহ্বানকে সমর্থন করে প্রচার চালাচ্ছে। জার্মানিতেও এ ধরনের সহিংস আন্দোলনের প্রচারে তারা যুক্ত হয়েছে।