শনিবার, 31 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

অভাব ঘোচাতে মালয়েশিয়ায় গিয়ে ফিরলেন কফিনবন্দী হয়ে, শেষ মা-বাবার স্বপ্ন

সংসারের আর্থিক অনটন দূর করতে একমাত্র ছেলে মনিরুল ইসলামকে মালয়েশিয়ায় পাঠিয়েছিলেন মা-বাবা। ছেলের পাঠানো সামান্য অর্থে কোনোমতে চলত চার সদস্যের পরিবার। তাঁদের আশা ছিল, মনিরুলের আয় বাড়বে, সংসারে ফিরবে সচ্ছলতা। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই নিভে গেল ২৪ বছর বয়সী এই তরুণের জীবন। শেষ পর্যন্ত কফিনবন্দী হয়ে বাড়ি ফিরেছেন তিনি।

অভাব ঘোচাতে মালয়েশিয়ায় গিয়ে ফিরলেন কফিনবন্দী হয়ে, শেষ মা-বাবার স্বপ্ন
ছবি: সংগৃহীত

সংসারের আর্থিক অনটন দূর করতে একমাত্র ছেলে মনিরুল ইসলামকে মালয়েশিয়ায় পাঠিয়েছিলেন মা-বাবা। ছেলের পাঠানো সামান্য অর্থে কোনোমতে চলত চার সদস্যের পরিবার। তাঁদের আশা ছিল, মনিরুলের আয় বাড়বে, সংসারে ফিরবে সচ্ছলতা। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই নিভে গেল ২৪ বছর বয়সী এই তরুণের জীবন। শেষ পর্যন্ত কফিনবন্দী হয়ে বাড়ি ফিরেছেন তিনি।

শুক্রবার সকালে রংপুরের পীরগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে মনিরুলের মরদেহ পৌঁছালে শোকের মাতম শুরু হয়। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর মা-বাবা। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে বাড়ির পরিবেশ।

মনিরুল ইসলাম রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের কুমারগাড়ী চন্দ্রকোনা গ্রামের ইয়াসিন আলীর ছেলে। এক ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে তিনিই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তান। সংসারের অভাব দূর করার আশায় ২০২৩ সালের মার্চে ধারদেনা করে তাঁকে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। এরপর তাঁর পাঠানো অর্থেই কোনোমতে চলছিল পরিবারের দৈনন্দিন খরচ। মনিরুলকে ঘিরেই ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতেন মা-বাবা।

পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ১৫ অক্টোবর মালয়েশিয়া থেকে মনিরুলের মৃত্যুর খবর পান তাঁরা। তবে কী কারণে বা কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য জানতে পারেননি। স্বজনদের জানানো হয়েছে, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার পর সকালে আর ঘুম থেকে ওঠেননি তিনি। পরে তাঁকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে দিশাহারা বাবা ইয়াসিন আলী। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘অনেক আশা নিয়ে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। এ জন্য নিজেই নিঃস্ব হয়ে গেছি। ভেবেছিলাম, সে টাকা উপার্জন করবে, সংসারটা ভালোভাবে চলবে। সব আশা-স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল। মনিরুল ছিল আমার সংসারের একমাত্র ভরসা। কপালপোড়া সংসার আমার। এখন কী হবে?’

ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই বিলাপ করছেন মা মনোয়ারা বেগম। বিদেশে যাওয়ার আগে মনিরুল তাঁকে অভাব দূর করার আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেই স্মৃতি মনে করে মা বলেন, ‘বিদেশে যাওয়ার আগে ছেলে বলেছিল, “মা চিন্তা করিস না। বিদেশোত চাকরি করি টাকা পটাইম, তোরা খাইমেন। অভাব আর থাইকপ্যার নয়।”’ কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, ‘আহা রে, এত ভালো ছেলেটা আমাকে ছেড়ে চলে গেল! আমি টাকা চাই না বাবা, আমার বুকে ফিরে আয়।’

স্বজনেরা জানান, পরিবারের আর্থিক সংকট কাটানোর পাশাপাশি মা-বাবার মুখে হাসি ফোটানোই ছিল মনিরুলের অন্যতম স্বপ্ন। বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে যা উপার্জন করতেন, তার একটি অংশ দেশে পাঠাতেন। সেই অর্থেই চলত পরিবারের খরচ। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পরিবারটি একদিকে যেমন একমাত্র সন্তানকে হারিয়েছে, অন্যদিকে হারিয়েছে জীবিকা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন।

বৃহস্পতিবার রাত পৌনে তিনটার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মনিরুলের মরদেহ গ্রহণ করেন স্বজনেরা। শুক্রবার সকালে মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে শেষবারের মতো তাঁকে দেখতে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় লোকজন সেখানে ভিড় করেন। জুমার নামাজের পর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

মনিরুলের মৃত্যুতে শোকাহত তাঁর অন্য স্বজনেরাও। চাচা আলতাফ হোসেন বলেন, ‘অনেক আশা নিয়ে ভাতিজাকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম; কিন্তু সে ফিরল লাশ হয়ে। কীভাবে তার মৃত্যু হলো, সেটাও আমরা জানি না। ১৫ অক্টোবর আসলে কী ঘটেছিল, তা জানতে চাই। তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনে আমরা সুষ্ঠু তদন্ত চাই।’