বুধবার, 28 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

সার্বিয়ায় সরকার পরিবর্তনের পর পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ প্রচারের দায় স্বীকার, ক্ষমা চাইল টিভি চ্যানেল

সার্বিয়ায় নির্বাচনে সাবেক প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দর ভুচিচের দলের পরাজয়ের পর পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ পরিবেশন এবং সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে যথাযথ প্রশ্ন তুলতে ব্যর্থ হওয়ার দায় স্বীকার করেছে দেশটির একটি রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন চ্যানেল। দর্শকদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে রেডিও টেলিভিশন ভয়ভোদিনা। একই সঙ্গে দেশটির গণমাধ্যমের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পদত্যাগের দাবিতে সরব হয়েছে ছাত্র আন্দোলন।

সার্বিয়ায় সরকার পরিবর্তনের পর পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ প্রচারের দায় স্বীকার, ক্ষমা চাইল টিভি চ্যানেল

সার্বিয়ায় নির্বাচনে সাবেক প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দর ভুচিচের দলের পরাজয়ের পর পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ পরিবেশন এবং সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে যথাযথ প্রশ্ন তুলতে ব্যর্থ হওয়ার দায় স্বীকার করেছে দেশটির একটি রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন চ্যানেল। দর্শকদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে রেডিও টেলিভিশন ভয়ভোদিনা। একই সঙ্গে দেশটির গণমাধ্যমের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পদত্যাগের দাবিতে সরব হয়েছে ছাত্র আন্দোলন।

গত রোববারের নির্বাচনে ভুচিচের দল অপ্রত্যাশিতভাবে পরাজিত হওয়ার পর এ ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়। নির্বাচনে জয়ী হয়েছে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ দূর করার অঙ্গীকার নিয়ে গড়ে ওঠা ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ আন্দোলন। নির্বাচনের পর দেশটির গণমাধ্যমে বড় ধরনের পরিবর্তন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ভুচিচ প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে টানা ১২ বছর সার্বিয়া শাসন করেছেন। এবারের নির্বাচনে তাঁর দলকে পরাজিত করেছে জনপ্রিয় ছাত্র আন্দোলন ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’। এ পরাজয়কে ভুচিচের দলের জন্য ঐতিহাসিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সার্বিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় একটি প্রদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যম রেডিও টেলিভিশন ভয়ভোদিনার সংবাদ উপস্থাপক গোরান এরোর বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সংবাদমাধ্যমটি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা নীরব থেকেছি, চোখ বন্ধ করে থেকেছি, একপেশেভাবে ঘটনাবলি তুলে ধরেছি এবং প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করতে ব্যর্থ হয়েছি। এ জন্য আমরা আমাদের দর্শকদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।’

ভুচিচের দলের পরাজয়ের পর রেডিও টেলিভিশন ভয়ভোদিনার ভারপ্রাপ্ত প্রধান সম্পাদক নেনাদ চাচিচ পদত্যাগ করেছেন। চ্যানেলটি এখন তাদের সংবাদ সম্প্রচার শুরু করছে স্টুডেন্ট লিস্টের নির্বাচনী বিজয় উদ্‌যাপনের দৃশ্য দিয়ে। অথচ নির্বাচনের আগের রাতে এসব দৃশ্য প্রচার করতে ব্যর্থ হয়েছিল তারা। ভুচিচের শাসনামলে পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ পরিবেশনের অভিযোগ তুলে ছাত্র আন্দোলন জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যমের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পদত্যাগ দাবি করেছে।

এদিকে, সোমবার সন্ধ্যায় বিক্ষোভকারীরা ইনফর্মার টিভি নামে আরেকটি টেলিভিশন চ্যানেলের কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। সে সময় চ্যানেলটিতে সরাসরি সম্প্রচার চলছিল। প্রায় ৩০ জন বিক্ষোভকারী সংবাদকক্ষে ঢুকে চ্যানেলটির প্রধান সম্পাদক ও মালিক দ্রাগান ভুচিচেভিচকে ঘিরে ধরেন। এ সময় তাঁদের কেউ কেউ ‘মুক্ত সার্বিয়ায় এভাবেই হয়’ এবং ‘ভুচিচ এখন কোথায়?’ বলে স্লোগান দেন। বিক্ষোভকারীদের মধ্যে কয়েকজন ভুচিচেভিচকে গ্রেপ্তারের দাবিও জানান।

২০২৪ সালে সার্বিয়ার নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর দেশটিতে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। টানা দুই বছর ধরে চলা বিক্ষোভের ধারাবাহিকতায় এবারের নির্বাচনে ভুচিচের দলের ঐতিহাসিক পরাজয় ঘটে। আন্দোলন ও পদযাত্রার পুরো সময়জুড়ে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে আসছিলেন, সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত রেডিও টেলিভিশন অব সার্বিয়া (আরটিএস) তাঁদের ক্রমবর্ধমান আন্দোলনের খবর যথাযথভাবে প্রচার করছে না।

মঙ্গলবার এক চিঠিতে শিক্ষার্থীরা আরটিএসের মহাপরিচালক, উপপ্রধান, সংবাদ পরিবেশনের দায়িত্বে থাকা প্রধান সম্পাদক এবং সব সংবাদ সম্পাদকের পদত্যাগ দাবি করেন। চিঠিতে তাঁরা জানান, শিক্ষার্থী ও অন্যান্য নাগরিকের মতামতকে কেন্দ্র করে তাঁদের লক্ষ্য করে অপমানজনক মন্তব্য ও বার্তা প্রচার করা হয়েছে। এসব বক্তব্য কোনো সমালোচনা ছাড়াই সম্প্রচার করাকে তাঁরা বিশেষভাবে অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেন।

নির্বাচনের রাতে ভুচিচ পরাজয় স্বীকার করার পর রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যম আরটিএস বেলগ্রেডের ঘটনাবলির সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়। অথচ রাজধানীজুড়ে তখন বিপুলসংখ্যক মানুষ ভোররাত পর্যন্ত নির্বাচনী বিজয় উদ্‌যাপন করছিলেন।

প্রায় সব ভোট গণনা শেষে দেখা গেছে, স্টুডেন্ট লিস্ট আন্দোলন মোট ভোটের ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ পেয়েছে। এর ফলে ২৫০ আসনের সংসদে আন্দোলনটি প্রায় ১৪০টি আসন পেতে যাচ্ছে। এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে অন্য কোনো দলের সঙ্গে জোট গঠন ছাড়াই এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে তারা। চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে নেতৃত্ববিহীন এই আন্দোলন একজন প্রধানমন্ত্রী মনোনীত করে নতুন সরকার গঠন করবে।

রেডিও টেলিভিশন ভয়ভোদিনার ক্ষমা চাওয়ার ঘটনা হাঙ্গেরির রাষ্ট্রায়ত্ত প্রধান টেলিভিশন চ্যানেলের একটি পদক্ষেপের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। গত এপ্রিলে হাঙ্গেরির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের ফিদেস দলের নির্বাচনী পরাজয়ের পর ওই চ্যানেলটিও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল।

এর তিন মাস পর হাঙ্গেরির চ্যানেলটি কালো পর্দায় একটি বার্তা প্রচার করে। সেখানে লেখা ছিল, ‘জনমাধ্যম মিথ্যা বলতে পারে না। বহু বছর ধরে তা করার জন্য আমরা ক্ষমাপ্রার্থী।’

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের (আরএসএফ) ২০২৬ সালের বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে সার্বিয়ার অবস্থান ১০৪তম। দেশটির ইতিহাসে এটিই সর্বনিম্ন অবস্থান। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বলকান অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যেও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে সার্বিয়ার অবস্থান সবচেয়ে খারাপ।