বুধবার, 28 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

গাজা-লেবানন-সিরিয়ায় নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা, ইরানকে দুর্বল করার পরিকল্পনায় নেতানিয়াহু

ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডানপন্থী সরকার গঠনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তাঁর পরিকল্পনায় রয়েছে গাজা, লেবানন ও সিরিয়ার গভীরে নিরাপত্তা অঞ্চল বজায় রাখা, ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে আরও দুর্বল করা এবং দেশটির কাছ থেকে ইসরায়েলের জন্য অস্তিত্বগত হুমকি স্থায়ীভাবে দূর করা। একই সঙ্গে ইসরায়েলের অস্তিত্বের বিরোধী আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট করে সরকার পরিচালনার সম্ভাবনাও নাকচ করেছেন তিনি।

গাজা-লেবানন-সিরিয়ায় নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা, ইরানকে দুর্বল করার পরিকল্পনায় নেতানিয়াহু

ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডানপন্থী সরকার গঠনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তাঁর পরিকল্পনায় রয়েছে গাজা, লেবানন ও সিরিয়ার গভীরে নিরাপত্তা অঞ্চল বজায় রাখা, ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে আরও দুর্বল করা এবং দেশটির কাছ থেকে ইসরায়েলের জন্য অস্তিত্বগত হুমকি স্থায়ীভাবে দূর করা। একই সঙ্গে ইসরায়েলের অস্তিত্বের বিরোধী আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট করে সরকার পরিচালনার সম্ভাবনাও নাকচ করেছেন তিনি।

স্থানীয় সময় মঙ্গলবার পশ্চিম জেরুজালেমে নিজের দল লিকুদ পার্টির সদর দপ্তরে সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে এসব কথা বলেন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশের সময় তিনি এ বক্তব্য দেন।

নেতানিয়াহু বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করে ইরানের কাছ থেকে অস্তিত্বগত হুমকি চিরতরে দূর করার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সামনে একটি ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ তৈরি হয়েছে।

সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা

নির্বাচনের প্রাথমিক পূর্বাভাসে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট এগিয়ে থাকলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। অর্ধেকের বেশি ব্যালট গণনার পর ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের পূর্বাভাসে বলা হয়, নেতানিয়াহুর জোট ৫৬টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোটের আসনসংখ্যা হতে পারে ৪৯।

এ অবস্থায় কোনো জোটই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট অবস্থানে নেই।

নেতানিয়াহু বলেন, নির্বাচনের প্রকৃত ফলাফল জানতে আরও এক থেকে দুই দিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে প্রাথমিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, তাঁর দল লিকুদ পার্টি পার্লামেন্টে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে বলে স্বীকার করেন তিনি।

ইসরায়েলি টেলিভিশন চ্যানেল ১২ ও ১৩-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, লিকুদ পার্টি ২৭টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টির আসনসংখ্যা দাঁড়াতে পারে ২১। এই হিসাব অনুযায়ী, পার্লামেন্টের অন্য দলগুলোর তুলনায় লিকুদ এগিয়ে রয়েছে।

গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় নিরাপত্তা অঞ্চল বজায় রাখার পরিকল্পনা

২০২২ সালে বর্তমান মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর তাঁর সরকারের সামরিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক বিভিন্ন অর্জনের কথা তুলে ধরেন নেতানিয়াহু। এসব অর্জনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা এমন সব অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছি, যা মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা বদলে দিয়েছে। আমরা (মোহাম্মদ) দেইফ, (ইসমাইল) হানিয়া, (ইয়াহিয়া) সিনওয়ার, (হাসান) নাসরুল্লাহ এবং (ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী) খামেনিকে নির্মূল করেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা গাজা, লেবানন ও সিরিয়ার গভীরে নিরাপত্তা অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করেছি। আমাদের ওপর ঝুলে থাকা তাৎক্ষণিক অস্তিত্বগত হুমকি, অর্থাৎ অবিলম্বে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা, আমরা দূর করেছি।’

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের প্রসঙ্গ টেনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ইরানের শাসকগোষ্ঠীর ওপর আঘাত হেনেছি এবং তাদের অতল গহ্বরের কিনারায় নিয়ে গেছি। ইরান এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দুর্বল, আর ইসরায়েল আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী।’

তাঁর বক্তব্যে গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় নিরাপত্তা অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল করার বিষয়গুলোকে ইসরায়েলের নিরাপত্তা কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি ট্রাম্পের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ইরানের কাছ থেকে অস্তিত্বগত হুমকি স্থায়ীভাবে দূর করার সম্ভাবনার কথাও বলেন তিনি।

সরকার গঠনে জটিল সমীকরণের আশঙ্কা

ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত অ্যালন পিঙ্কাসের মতে, নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলকে সরকার গঠনের জন্য অস্বস্তিকর কোনো জোট চুক্তিতে যেতে হতে পারে। তিনি নিউইয়র্ক সিটিতে ইসরায়েলের কনসাল জেনারেল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

পিঙ্কাস মনে করেন, বিরোধী শিবিরের ভোটাররা নেতানিয়াহুর জোটের সঙ্গে সমঝোতা করে সরকার গঠনের উদ্যোগকে সমর্থন করতে চাইবেন না। ফলে নির্বাচনের পর সরকার গঠনের আলোচনা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

আল জাজিরার জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারার মতে, জেরুজালেমে দেওয়া বক্তব্যে নেতানিয়াহু নিজের দলের নির্বাচনী সম্ভাবনা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

বিশারা বলেন, ‘স্পষ্টতই তিনি এমন এক ধরনের সাফল্যের চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করছেন, যার দাবি করার মতো অবস্থানে তিনি নেই। প্রথমত, তিনি সরকার গঠনের জন্য জোট তৈরি করতে পারবেন না। দ্বিতীয়ত, ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় দল হওয়ার বিষয়টি আড়াল করে দিচ্ছে যে, ২০০৯ সালের পর লিকুদ এবারই সবচেয়ে কম আসনে নেমে এসেছে।’

নির্বাচনী ফলাফল নিজেদের পক্ষে তুলে ধরার চেষ্টা

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড্যান পেরি বলেন, বুথফেরত জরিপ প্রকাশের পর তৈরি হওয়া পরিস্থিতিকে যতটা সম্ভব নিজেদের অনুকূলে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন নেতানিয়াহু। তাঁর মতে, নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশের পর দেওয়া বক্তব্যে নেতানিয়াহু নিজের দলের অবস্থান ও অর্জনকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেছেন।

তবে প্রাথমিক পূর্বাভাসে লিকুদ পার্টি সবচেয়ে বড় দল হিসেবে এগিয়ে থাকলেও নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ফলে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল এবং পরবর্তী জোট আলোচনা ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ সরকার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।