আফগানিস্তানে চোখের কর্নিয়া প্রতিস্থাপন নিষিদ্ধ করেছে তালেবান সরকার। এ সিদ্ধান্তের ফলে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার আশায় থাকা শত শত রোগী প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, এই চিকিৎসাপদ্ধতি ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
২০২১ সালে পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকে আফগানিস্তানে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সুযোগ সীমিত করে বিভিন্ন নির্দেশনা জারি করে আসছে তালেবান সরকার। কর্নিয়া প্রতিস্থাপন বন্ধের সিদ্ধান্তকে সেই ধারাবাহিকতার সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সম্প্রতি একটি চিকিৎসাসেবামূলক দাতব্য সংস্থা রাজধানী কাবুল ও পূর্বাঞ্চলীয় শহর জালালাবাদে স্থানীয় চিকিৎসকদের কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। তবে এর কয়েক মাসের মধ্যেই এ চিকিৎসাপদ্ধতি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
চিকিৎসকদের মতে, বিস্ফোরণ, দুর্ঘটনা ও বিভিন্ন ধরনের আঘাতে দৃষ্টিশক্তি হারানো মানুষের জন্য আফগানিস্তানে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের ব্যাপক প্রয়োজন রয়েছে।
কাবুলের নূর আই হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. নূর জামান হাশিম জানান, তালেবানের নির্দেশে কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার আগে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তাঁর হাসপাতালের চিকিৎসকেরা ৯০টি কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করেছিলেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে হাসপাতালটিতে অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় থাকা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। তাঁদের অধিকাংশই তরুণ। আঘাত, দুর্ঘটনা, বিস্ফোরণ এবং ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করতে গিয়ে চোখের ক্ষতির কারণে এসব রোগী দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন।
ডা. নূর জামান বলেন, কয়েক দশকের সহিংসতায় আফগানিস্তানের স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের চাহিদা পূরণের জন্য পর্যাপ্ত চক্ষু বিশেষজ্ঞ নেই। পাশাপাশি দেশটির অভ্যন্তরেও প্রয়োজনীয় কর্নিয়া পাওয়া যায় না।
তিনি আরও জানান, তালেবান কর্তৃপক্ষ মৌখিকভাবে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। নির্দেশ অমান্য করলে কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে বলে চিকিৎসকেরা এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস পাচ্ছেন না।
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ভিত্তিক দাতব্য সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন অব ফিজিশিয়ানস অব পাকিস্তানি ডিসেন্ট অব নর্থ আমেরিকা (এপিপিএনএ) ২০১৭ সাল থেকে পাকিস্তানে বিনা মূল্যে কর্নিয়া সরবরাহ করে আসছে। অঙ্গদানের মাধ্যমে এসব কর্নিয়া সংগ্রহ করা হয়।
চলতি বছরের শুরুতে সংস্থাটি আফগানিস্তানেও তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে। এর আওতায় দেশটিতে ১৫০টির বেশি কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়। এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে পাকিস্তানের পেশোয়ারে তিনজন আফগান চক্ষু বিশেষজ্ঞকে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছিল।
এপিপিএনএর কর্নিয়া কর্মসূচির প্রধান এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জাফফার মীর ফাউন্ডেশনের প্রধান ডা. ফাওয়াদ জাফফার জানান, ২০১৭ সাল থেকে তাঁদের সংস্থা পাকিস্তানে বিনা মূল্যে কর্নিয়া সরবরাহ করে আসছে। এর মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার মানুষ উপকৃত হয়েছেন।
তিনি বলেন, প্রায় চার মাস আগে আফগানিস্তানেও কর্মসূচিটি সম্প্রসারণ করা হয়। দেশটিতে শত শত মানুষের কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তালেবানের নির্দেশনার কারণে কার্যক্রমটি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার কারণে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা রোগীদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
কাবুলের আখের রস বিক্রেতা সালামত খান ২০২৩ সালে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দৃষ্টিশক্তি হারান। বিনা মূল্যে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের সুযোগের কথা জানতে পেরে তিনি হাসপাতালে যোগাযোগ করেন।
সালামত খান জানান, কর্মসূচিটির মাধ্যমে চিকিৎসা নিয়ে উপকৃত হওয়া এক ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি বিনা মূল্যে অস্ত্রোপচারের সুযোগ সম্পর্কে জানতে পারেন। পরে হাসপাতালে গেলে চিকিৎসকেরা তাঁকে সেপ্টেম্বরে অস্ত্রোপচারের সময় নির্ধারণের কথা জানান। কিন্তু আগস্টে কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে তিনি হতবাক হয়ে যান।
এ নিষেধাজ্ঞার আরেক ভুক্তভোগী ৪০ বছর বয়সী খাদিজা বেগম। জালালাবাদে বিস্ফোরণে চোখে আঘাত পাওয়ার পর তিনি স্থানীয় আই হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিবন্ধন করেছিলেন।
খাদিজা বেগম বলেন, দুই মাস আগে তিনি হাসপাতালে নিবন্ধন করেন। কিন্তু গত মাসে তালেবান কর্তৃপক্ষ হাসপাতালকে কর্মসূচিটি বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। তাদের দাবি, কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের চিকিৎসাপদ্ধতি ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থি।
এ পরিস্থিতিতে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন কর্মসূচি পুনরায় চালুর আহ্বান জানিয়েছে এপিপিএনএ। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি তালেবান সরকারের প্রতি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।