কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্তোরাঁ অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তবে নিখোঁজের তালিকায় থাকা নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৭) নামের এক নারীর পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। মঙ্গলবার শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ঢাকার দুটি পরিবারের ছয় ও চার সদস্য রয়েছেন। সোমবার সন্ধ্যায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রিমন ঘোষ জানান, ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার পরিবারের কাছে মরদেহগুলো হস্তান্তর করা হবে। একই দিন তদন্তের অগ্রগতি নিয়েও সংবাদমাধ্যমকে জানানো হবে।
নিহতদের মধ্যে একটি পরিবারের সদস্য মৌলিতা মেহজাবিন আলভি (১৯), তাঁর চাচাতো বা খালাতো বোন লায়লা জাহান নাবিলা (২৫) ও ইসরাত জাহান মালিহা (২৭) রয়েছেন। তাঁদের আত্মীয় ফারিয়া কবির (৩৩), ফারিয়ার ছয় বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ ফাইজান নূর এবং ফারিয়ার ভাই মোহাম্মদ নাফিস তেহামিও (২৪) আগুনে নিহত হয়েছেন। তাঁরা ঢাকার বনশ্রী ও খিলগাঁও এলাকায় থাকতেন।
নাফিস তেহামি ‘জেরিফ’ নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। মৌলিতা মেহজাবিন আলভি ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে জনসংখ্যা ও জনস্বাস্থ্যবিজ্ঞান বিষয়ে অধ্যয়নরত ছিলেন। লায়লা জাহান নাবিলা ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী।
নিহত অপর চারজন একই পরিবারের সদস্য। তাঁরা হলেন ঢাকার শ্যামলীতে গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাহিদুর রহমান (৪১), তাঁর স্ত্রী আফসানা মতিন (৩৬) এবং তাঁদের দুই মেয়ে রোজাইনা ইনায়া (৯) ও মুনাইনা ইহানা (৬)।
নিখোঁজ নারীর ডিএনএ মেলেনি
অগ্নিকাণ্ডের পর উদ্ধার হওয়া ১০টি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। তবে নিখোঁজের তালিকায় থাকা আরও একজনের বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রিমন ঘোষ জানান, নিখোঁজ নাসরিন আক্তার মুক্তার ডিএনএর সঙ্গে উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর নমুনার কোনো মিল পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, “১০ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছিল, তাদের ডিএনএ স্যাম্পলই মিল পাওয়া গেছে। আরেকজনেরটা পাওয়া যায়নি।”
মুক্তা ঢাকার উপকণ্ঠ সাভারের আশুলিয়ায় স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। দুই বান্ধবীর সঙ্গে বেড়াতে কক্সবাজারে গিয়েছিলেন তিনি। তাঁর স্বামী দেওয়ান ফয়সাল ঢাকা জেলা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক নেতা। মুক্তার বাবার নাম মোস্তফা কামাল।
অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্ট থেকে প্রথমে ১০টি মরদেহ উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছিল। কিন্তু নিখোঁজের তালিকায় ছিলেন ১১ জন। ফলে উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা ও নিখোঁজ ব্যক্তির হিসাবের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। মুক্তার ডিএনএ না মেলার তথ্য সেই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
মামলায় আসামি ২৩, রিসোর্টের মালিক পলাতক
১৭ অক্টোবর রাতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ। মামলায় রিসোর্টের মালিক মোহাম্মদ তানভীর সুলতান মিয়াকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর থেকে তানভীর পলাতক রয়েছেন। রিসোর্টের আরেক মালিক নেওয়াজ মোর্শেদও আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত রিসোর্টের সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ঘটনার দিন সকালে উখিয়ার পাটুয়ারটেক সৈকতের কাছে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন তিনতলা টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। কক্সবাজার শহর থেকে দক্ষিণে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরে রিসোর্টটির অবস্থান।
রিসোর্টটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার আটটি কক্ষে পর্যটকেরা অবস্থান করছিলেন। নিচতলায় ছিল রেস্তোরাঁ ও কর্মীদের থাকার ব্যবস্থা। আগুনে ভবনটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। পরে সেখান থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।