বৃহস্পতিবার, 15 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

পাইলটদের মধ্যে ‘মারামারি’, ইসরায়েলগামী বিমান নামল সৌদি

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এফজেড ১০৭৩ ফ্লাইটটি বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ভোরে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তেলআবিবের বেনগুরিয়ন বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হয়। জর্ডানের আকাশসীমায় থাকার সময় হঠাৎ বিমানটির গতিপথ পরিবর্তন করে সৌদি আরবের দিকে নেওয়া হয়।

পাইলটদের মধ্যে ‘মারামারি’, ইসরায়েলগামী বিমান নামল সৌদি
চিত্র: সংগৃহীত

সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাই থেকে ইসরায়েলের উদ্দেশে যাত্রা করা ফ্লাইদুবাইয়ের একটি যাত্রীবাহী বিমানের ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে কথিত ‘মারামারি’র ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। এ সময় বিমান থেকে একাধিক জরুরি সংকেত পাঠানো হলে কিছুক্ষণের জন্য সম্ভাব্য ছিনতাইয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়। পরে গতিপথ পরিবর্তন করে বিমানটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে। এতে ক্যাপ্টেন ও কো-পাইলট দুজনই আহত হয়েছেন।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এফজেড ১০৭৩ ফ্লাইটটি বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ভোরে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তেলআবিবের বেনগুরিয়ন বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হয়। জর্ডানের আকাশসীমায় থাকার সময় হঠাৎ বিমানটির গতিপথ পরিবর্তন করে সৌদি আরবের দিকে নেওয়া হয়।

এ সময় বিমানটি তিনটি জরুরি সংকেত পাঠায়। এর একটি সংকেতে বিমানে সম্ভাব্য বেআইনি হস্তক্ষেপের কথা জানানো হয়। পাইলটদের মধ্যে কথিত হাতাহাতির সময় বিমানটি দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে। মাত্র দুই মিনিটে প্রায় ১৬ হাজার ফুট নিচে নেমে যায় বিমানটি।

তাবুকে জরুরি অবতরণ

ঘটনা সম্পর্কে অবহিত এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা বলেন, ককপিটে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছিল এবং এতে পাইলটরা জড়িত ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিমানে বেশ কয়েকজন ইসরায়েলি নাগরিক ছিলেন। সম্ভাব্য ছিনতাইয়ের আশঙ্কায় ইসরায়েলি কর্মকর্তারা যুদ্ধবিমান পাঠান। পরে বিমানটি সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবুক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।

বিমানবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের বিবৃতির বরাতে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে বিমানটি তাবুকে অবতরণ করে। এতে থাকা ক্যাপ্টেন ও কো-পাইলট দুজনই আহত হন। পরে তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়।

এর আগে ফ্লাইদুবাই জানিয়েছিল, এফজেড ১০৭৩ ফ্লাইটটি গন্তব্যে যাওয়ার পথে একটি ঘটনার মুখে পড়ে। পরে বিমানটি তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করে। বিমানের সব যাত্রী নিরাপদে আছেন এবং তাদের সবার হিসাব পাওয়া গেছে।

যাত্রীর বর্ণনায় ছুরিকাঘাতের দাবি

বিমানের এক যাত্রী জেরুজালেম পোস্টকে বলেন, এক পাইলট অন্য পাইলটকে ছুরিকাঘাত করেন। এরপর তিনি তাকে ককপিট থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় বিমানটি দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে। অন্য ইসরায়েলি যাত্রীরা ককপিটে ছুটে গিয়ে হামলাকারী পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে আনেন।

তবে দ্য গার্ডিয়ান এসব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করতে পারেনি। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে এমন একজন যাত্রীকে দেখা গেছে, যার শার্টে রক্তের দাগ রয়েছে।

বিমানের ভেতরে তোলা একটি ছবিতেও এক ব্যক্তির টি-শার্টে রক্তের দাগ দেখা যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

বিমানে থাকা এক যাত্রীর মা ইয়াসমিন আবু কাইস বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, তার মেয়ে চিৎকারের শব্দ শুনেছেন। এক ব্যক্তির হাতে ছুরি ছিল। ওই ব্যক্তি এক পাইলটকে মেঝেতে ফেলে দেন। চারদিকে রক্ত ছিল বলে তার মেয়ে জানিয়েছেন।

কী ঘটেছিল, তদন্তে একাধিক সম্ভাবনা

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন মুখপাত্র প্রথমে জানিয়েছিলেন, ছিনতাইয়ের চেষ্টার কারণে বিমানটির গতিপথ পরিবর্তন করা হয়নি। পরে কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা ঘটনাটি তদন্ত করে দেখছে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম নাম প্রকাশ না করে কয়েকজন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে জানায়, এক পাইলট আত্মহত্যার চেষ্টায় বিমানটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ফ্লাইটের ক্রু দলের অন্য সদস্যরা তাকে থামিয়ে দেন বলে জানা গেছে।

ইসরায়েলিদের ওপর হামলার উদ্দেশ্যে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছিল কি না, সেই সম্ভাবনাও তদন্তে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে তদন্ত এখনো চলছে।

ঘটনার পেছনে কী ছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়। যাত্রীরা ওই সময়ের বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন। এ ঘটনায় রক্তপাতের ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে।

সামরিক প্রধানের যুক্তরাষ্ট্র সফর স্থগিত

ঘটনার পর ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আইয়াল জামির আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে নির্ধারিত সফর স্থগিত করেছেন। সফরে যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ এবং ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধানের সঙ্গে তার বৈঠকের কথা ছিল।

সৌদি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিমানের সব যাত্রী নিরাপদ আছেন। ক্যাপ্টেন ও কো-পাইলট দুজনকেই চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

সৌদি আরবের অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী। অনুমতি পেলে আটকে পড়া যাত্রীদের ইসরায়েলে ফিরিয়ে নিতে তারা উড়াল দেবে।

এ ঘটনার কারণে তেলআবিবের উদ্দেশে যাত্রা করা ফ্লাইদুবাইয়ের আরেকটি ফ্লাইট মাঝ আকাশ থেকে ঘুরে দুবাইয়ে ফিরে গেছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম।

ফ্লাইদুবাই এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আমাদের দল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। আরও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেলে পরবর্তী হালনাগাদ তথ্য দেওয়া হবে।’

ইসরায়েলের বিমান নিরাপত্তা নিয়ে পুরোনো প্রেক্ষাপট

ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যার মাত্র কয়েক দিন আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সতর্ক করে বলেছিলেন, অক্টোবরে ইসরায়েলের নির্বাচন চলাকালে হামলা হতে পারে, এমন কিছুর ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দেশটির সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে, ইসরায়েলের ওপর হামলার কোনো পরিকল্পনা করা হচ্ছে—এমন কোনো গোয়েন্দা তথ্য তাদের কাছে ছিল না।

১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েলগামী ও ইসরায়েলি বিমান ছিনতাই এবং এসব বিমানে হামলার একাধিক ঘটনা ঘটিয়েছিল। তবে কয়েক দশক ধরে এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি।

ইসরায়েলে বিশ্বের অন্যতম কঠোর বিমানবন্দর নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে। দেশটিতে যাওয়ার বিমানে ওঠার আগে যাত্রীদের নিরাপত্তা তল্লাশি করা হয়।

২০২০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে বিমান চলাচল শুরু হয়। সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের এখনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। তবে ২০২৫ সালে চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থার কারণে একটি বিমান রিয়াদে অবতরণ করেছিল।