শনিবার, 7 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

কর্মসংস্থান বাড়াতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন বাড়াচ্ছে পিকেএসএফ

নতুন এই রূপরেখার অধীনে সাধারণ পর্যায়ের উদ্যোগীদের সর্বোচ্চ অর্ধকোটি টাকা এবং নির্দিষ্ট শিল্প ক্লাস্টারের অন্তর্ভুক্ত মধ্যবর্তী পণ্য প্রস্তুতকারকদের দুই কোটি টাকা পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ প্রদানের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

কর্মসংস্থান বাড়াতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন বাড়াচ্ছে পিকেএসএফ
সারাদেশে জীবিকার নতুন ক্ষেত্র প্রসারিত করতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎপাদন সক্ষমতা জোরদার এবং মধ্যবর্তী পণ্য তৈরিতে আর্থিক সহায়তা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)।

নতুন এই রূপরেখার অধীনে সাধারণ পর্যায়ের উদ্যোগীদের সর্বোচ্চ অর্ধকোটি টাকা এবং নির্দিষ্ট শিল্প ক্লাস্টারের অন্তর্ভুক্ত মধ্যবর্তী পণ্য প্রস্তুতকারকদের দুই কোটি টাকা পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ প্রদানের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সঙ্গে আলাপকালে এই কৌশলগত পরিবর্তনের বিস্তারিত তুলে ধরেন পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের।

তিনি উল্লেখ করেন, একটি ক্ষুদ্র ব্যবসা বা উৎপাদন কেন্দ্রে সরাসরি একজনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অগ্রবর্তী ও পশ্চাৎবর্তী সংযোগ বা লিংকেজের সুবাদে আরও প্রায় চারজন মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে কেবল উদ্যোক্তার সংখ্যা বৃদ্ধির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে, সামগ্রিক উৎপাদন কাঠামো এবং বিতরণ নেটওয়ার্ককে হিসাবে নিয়ে পুঁজির সংস্থান করতে চায় সংস্থাটি। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রসারের পাশাপাশি সহায়ক খাত, সরবরাহকারী ও পরিবেশকদের মাঝেও যেন ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থানের আবহ তৈরি হয়, সেই লক্ষ্যেই এগোচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

নতুন ঋণ কৌশলের অন্যতম মূল ভিত্তি হলো দেশীয় কাঁচামালের মূল্য সংযোজন ঘটিয়ে উচ্চমূল্যের বাণিজ্যিক সামগ্রীতে রূপান্তর করা। এই প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, দেশকে শুধুই প্রাথমিক স্তরের কাঁচামাল জোগানদাতা হিসেবে না রেখে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে সর্বোচ্চ মুনাফা ও উপযোগ তৈরির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, দুগ্ধ খাত থেকে ঘি, পনির, লাবান কিংবা দুগ্ধজাত নানা পানীয় এবং ফলমূল বিশেষ করে আম থেকে পাল্প ও ভিনেগারের মতো প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উৎপাদনে উৎপাদকদের দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। যেহেতু এই ধরনের প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বড় অঙ্কের মূলধনের সংস্থান প্রয়োজন, সে কারণেই ঋণ বরাদ্দের সীমা ৫০ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা পর্যন্ত পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

মধ্যবর্তী পণ্যের বাজার সম্ভাবনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি ভৈরবের পাদুকা শিল্পের দৃষ্টান্ত টানেন। সেখানে সহস্রাধিক জুতা তৈরির কারখানা থাকলেও তাদের জন্য অন্যতম অপরিহার্য উপাদান হচ্ছে জুতার সোল। টেক্সটাইল বর্জ্য বা ঝুট ব্যবহার করে এই সোল তৈরি সম্ভব হলেও ইউনিট স্থাপনে মোটা অঙ্কের অর্থের দরকার পড়ে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, সাধারণ ক্রেতারা সরাসরি সোল ক্রয় না করলেও জুতা নির্মাতারা এগুলো নিয়মিত সংগ্রহ করেন, যার কারণে এগুলো মধ্যবর্তী পণ্য হিসেবে বিবেচিত। এমন সহযোগী ক্ষুদ্র শিল্পগুলোকে পুঁজি সহায়তা দিলে একাধারে নতুন পণ্যের বিকাশ ঘটবে এবং পুরো শিল্প খাতে মানবসম্পদের কাজের পরিধিও বৃদ্ধি পাবে।

তিনি আরও অভিমত ব্যক্ত করেন যে, কোনো একক উদ্যোগকে বিচ্ছিন্নভাবে মূল্যায়ন করলে অর্থনীতিতে তার প্রকৃত অবদান অনুধাবন করা যায় না। একটি প্রকল্পের সঙ্গে কাঁচামালের প্রবাহ, পণ্য প্রস্তুতি, পরিবহন, প্রচার ও সামগ্রিক সরবরাহ চেইনের বহু ধাপ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তাই কার্যকর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হলে পুরো সরবরাহ ও মূল্য শৃঙ্খলকে অর্থায়নের সুরক্ষাবলয়ে নিয়ে আসা আবশ্যক।

দীর্ঘ প্রায় ৩৬ বছর ধরে উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও কাজের সুযোগ তৈরিতে নিয়োজিত থাকা পিকেএসএফ এখন কেবল তহবিলের অঙ্ক বাড়ানোর চেয়ে অর্থায়নের অর্জিত ফলাফলের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। বিনিয়োগের ফলে সরবরাহ শৃঙ্খলার উন্নয়ন এবং সেখানে বাস্তব অর্থে কতজন মানুষের স্থায়ী কর্মসংস্থান নিশ্চিত হচ্ছে, সেটিই এখন মূল বিবেচ্য। তিনি নিশ্চিত করেন যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক পিকেএসএফের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন লাইন অনুমোদন করেছে, যার প্রাথমিক কিস্তির তহবিল ইতোমধ্যে অবমুক্ত হয়েছে। প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে ৯৯ শতাংশ ঋণ পুনরুদ্ধারের সাফল্য বজায় রেখেই সংস্থাটি এখন কর্মসংস্থানমুখী ফলাফলে মনোযোগ দিচ্ছে।

সবশেষে সামগ্রিক ভ্যালু চেইনের আধুনিকায়নে শুধু ব্যাংকঋণই যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন তিনি। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করতে সরকারি পর্যায়ের অনুদান ও সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন। ইতোমধ্যে চার শতাধিক ভ্যালু চেইনে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় এই উদ্যোগ সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি, যার মাধ্যমে শিল্প উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান উভয় ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।