শুক্রবার, 6 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

জাপান সফরে তৃতীয় দেশ বা বঙ্গোপসাগর নিয়ে আলোচনা হয়নি: বিগ - বি প্রসঙ্গে হুমায়ুন কবির

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক জাপান সফরে বাংলাদেশ ও জাপানের বিশেষ অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের উদ্যোগ ‘বিগ-বি’ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এ আলোচনায় ভারত, নেপাল ও ভুটানসহ কোনো তৃতীয় দেশ কিংবা বঙ্গোপসাগর ও সমুদ্রপথের বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল না বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, সফরটি ছিল সম্পূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বিশেষ করে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের উদ্দেশ্যে।

জাপান সফরে তৃতীয় দেশ বা বঙ্গোপসাগর নিয়ে আলোচনা হয়নি: বিগ - বি প্রসঙ্গে  হুমায়ুন কবির
ছবি: সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক জাপান সফরে বাংলাদেশ ও জাপানের বিশেষ অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের উদ্যোগ ‘বিগ-বি’ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এ আলোচনায় ভারত, নেপাল ও ভুটানসহ কোনো তৃতীয় দেশ কিংবা বঙ্গোপসাগর ও সমুদ্রপথের বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল না বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, সফরটি ছিল সম্পূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বিশেষ করে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের উদ্দেশ্যে।

শুক্রবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।

বাংলাদেশ ও জাপানের অংশীদারত্বের উদ্যোগ বিগ-বিতে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, নেপাল ও ভুটানকে যুক্ত করার বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে দুই দেশের সরকারপ্রধানের যৌথ বিবৃতি তুলে ধরেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, বিবৃতিতে তৃতীয় কোনো দেশের প্রসঙ্গ নেই, এমনকি বঙ্গোপসাগরের বিষয়েও কিছু বলা হয়নি। অন্য কোনো দেশকে নিয়ে আলোচনা করতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের প্রতিনিধিদেরও আলোচনায় উপস্থিত থাকতে হবে বলে মনে করে বাংলাদেশ সরকার।

তিনি বলেন, “সুতরাং, ওই ধরনের কোনো আলোচনাও হয়নি, ওই ধরনের কোনো তৃতীয় দেশ নিয়ে কোনো কথাও হয়নি। এটি ছিল একান্ত আলোচনার বিষয়। যৌথ বিবৃতিতে আপনারা দেখতে পাবেন, জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে বিশেষ অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের অংশ হিসেবে আমরা বিগ-বি নিয়ে আলোচনার কথা বলেছি।”

জাপান সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বিগ-বির দ্বিপক্ষীয় চরিত্র স্পষ্ট করা হয়েছিল জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “জাপান সরকারের সঙ্গে আমাদের আলোচনায় আমরা বিষয়টি স্পষ্ট করেছি যে, বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বিশেষ করে অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করতেই আমরা টোকিওতে এসেছি।”

জাপানের অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিরাপদ সমুদ্রপথ তৈরির উদ্যোগে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, “শুধু দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে আলোচনার জন্য জাপান সফরে গেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান; বঙ্গোপসাগর কিংবা সমুদ্রপথ নিয়ে আলোচনার জন্য নয়। এগুলো আলোচনা করতে হলে অন্যান্য অংশীদারকেও আলোচনার টেবিলে থাকতে হবে।

“বঙ্গোপসাগর তো শুধু আমাদের একার নয়। এখানে আমাদের বড় ধরনের অংশীদারত্ব রয়েছে, তবে আমরা একা নই। তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আলোচনার টেবিলে রাখতে হবে। আমরা এখানে দ্বিপক্ষীয় বিশেষ অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা করেছি, যা যৌথ বিবৃতিতেও স্পষ্টভাবে বলা আছে। তো এর বাইরে আমরা কোনো আলাপ-আলোচনা করি নাই।”

সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে নির্বাচিত হওয়ায় তারেক রহমানের সরকারের জনগণের স্বার্থের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। সংবেদনশীল জাতীয় বিষয়গুলো প্রয়োজন হলে সংসদেও আলোচনা করা হবে।

তিনি বলেন, “আমরা যা করব, তা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে করব। অতীতে যেভাবে হয়েছে, এবার সেভাবে কোনো কিছু আড়ালে রাখার সুযোগ নেই।”

জাপান সফরের যৌথ বিবৃতি চূড়ান্ত করতে দীর্ঘ আলোচনা ও দরকষাকষি হয়েছে উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, “তো নেগোসিয়েশনে দেখেন, অন্যান্য দেশের বিবৃতি দেখেন, স্টেটমেন্ট দেখেন আর এই স্টেটমেন্ট দেখুন, তখন টার্ম পাবেন কতটুকু দেশপ্রেমিক এই নির্বাচিত সরকার; মানুষের পক্ষের এই সরকার।

“এই দেশের মানুষকে, এই দেশের মাটিকে ঠকিয়ে আমরা কিছু করব না। জাপান সরকারও বাংলাদেশ সরকারের এ দৃষ্টিভঙ্গিকে শ্রদ্ধা করে এবং যেকোনো দেশই করবে।”

আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “যেভাবে গত ১৫ বছর আমরা দেখছি— গোলামি করে বেড়াইছে, মানে স্বৈরাচার ছিল, দুর্নীতিগ্রস্ত ছিল এবং পুরোপুরি একটা গোলাম সরকার ছিল।

“এই গোলামি থেকে বাংলাদেশ বের হইছে, এখন কিন্তু বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহটা অন্যরকম। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বিষয়ে মানুষের আকর্ষণ আন্তর্জাতিকভাবে অনেক উঁচু।”

এদিকে বিগ-বি উদ্যোগের কারণে বাংলাদেশের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকলে তা নিয়ে আলোচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তাঁর বক্তব্যের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীকে দেশের বৃহত্তম ধর্মীয় রাজনৈতিক দল উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, “আমি বলব, জামায়াতে ইসলামী দেশের বৃহত্তম ধর্মীয় রাজনৈতিক দল। ফলে আমরা তাদের কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ ও যোগাযোগ প্রত্যাশা করি।

রোহিঙ্গা সংকট নিরসন এবং এ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় জাপানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে নিপ্পন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের দেওয়া নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, নিপ্পন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান জাপান সরকারের রোহিঙ্গা বিষয়ক বিশেষ দূতের দায়িত্বেও রয়েছেন।

হুমায়ুন কবির বলেন, “তো, এখানে রোহিঙ্গা ইস্যুর ব্যাপারে জাপান আমাদেরকে সহযোগিতা করবে। তাদের জন্য যতটুকু এখানে সম্ভব, তারা সেভাবে এগিয়ে আসবে।”

জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর অর্থ ব্যাখ্যা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগে বাংলাদেশ উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে সহজ শর্তের ঋণ ও অনুদানের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল ছিল। সেই অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগ ও পারস্পরিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়।

তিনি বলেন, “যার সঙ্গেই আমরা ব্যবসা করি, সত্যিকারের পারস্পরিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের ভিত্তিতে সেটা করব। এটা হচ্ছে, মর্যাদাপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব। এখানে কেউ কারও থেকে গৌণ বা কারও উপর নির্ভরশীল নয়, এটা যৌথ অংশীরদারত্ব। এ ধরনের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আমরা গড়ে তুলছি।”

জাপানের সঙ্গে এক ট্রিলিয়ন ইয়েনের বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক করবে। পাশাপাশি জাপান থেকে একটি অর্থনৈতিক মিশন শিগগির বাংলাদেশ সফরে আসবে।

জাপানি অর্থায়নের সুদের হার এবং ছয় বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ছয় বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিটি এসেছে বেসরকারি খাত থেকে। আলোচনা করে বাংলাদেশের প্রয়োজন, অর্থায়নের ব্যয় এবং অন্যান্য উৎসের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক শর্ত বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগ গ্রহণ করা হবে।

তিনি বলেন, “ছয় বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতিটা বেসরকারি খাতের। আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে আমরা দেখব, আমাদের প্রয়োজনের সঙ্গে সুদের হার কোথায় সহায়ক, সুলভ ও অর্থমূল্য ঠিক থাকবে। ওই বিনিয়োগগুলা আমরা গ্রহণ করব।

“এখানে নমনীয়তাতো আছে অবশ্যই। আমাদের জাতীয় স্বার্থের ভেতরে বিনিয়োগ থাকবে, যে বিনিয়োগগুলো কর্মসংস্থান তৈরি করবে এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী বিকল্পের সঙ্গে মিলে যেটা প্রতিযোগিতামূলক হবে, আমরা সেখানে যাব।”

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ছয় বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি থাকলেও আলোচনা ও যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকল্প গ্রহণের সুযোগ সরকারের রয়েছে।

জাপানের সম্রাটের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ না হওয়ার বিষয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, “আমি বলব, জাপান সম্বন্ধে একটু খোঁজখবর নেন। জাপানের রাজা রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তাই এ প্রশ্নের আগে বোধহয় একটু গবেষণা করলে ভালো হইত আরকি।”