শুক্রবার, 6 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

‘জামায়াতে হারিয়ে যাচ্ছে’ এনসিপি, পদত্যাগ সামান্তার

বৃহস্পতিবার বিকেলে দলের বর্তমান আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে ডিজিটাল মাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপে তিনি নিজের ইস্তফাপত্র জমা দেন।

‘জামায়াতে হারিয়ে যাচ্ছে’ এনসিপি, পদত্যাগ সামান্তার
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে সরে দাঁড়ানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন দলটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরিচিত মুখ সামান্তা শারমিন।

বৃহস্পতিবার বিকেলে দলের বর্তমান আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে ডিজিটাল মাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপে তিনি নিজের ইস্তফাপত্র জমা দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের এই প্রাক্তন শিক্ষার্থী এনসিপি গঠনের আগে জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখপাত্র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

দুই বছর আগে তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে দলটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় তিনি এর জ্যেষ্ঠ আহ্বায়ক ছিলেন। তবে গত ২৩ অক্টোবর দলের নতুন কমিটিতে তাকে যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে রাখা হয়, যাকে তিনি 'পদাবনতি' হিসেবে দেখেছেন এবং এর ঠিক দুই সপ্তাহ পরই দলত্যাগের এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ বার্তায় দল ছাড়ার পেছনের কারণগুলো বিস্তারিত তুলে ধরেছেন সামান্তা। তার মূল অভিযোগ, নিজস্ব কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক রূপরেখা না থাকায় এনসিপি ধীরে ধীরে জামায়াতে ইসলামীর মাঝে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। যে তরুণেরা একসময় রাজপথের অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাদের তৈরি দলটি এখন বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে জামায়াতের সহায়ক ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি হিসেবে কাজ করছে। তিনি মনে করেন, একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত এনসিপির নতুন ধারার রাজনীতির সম্ভাবনাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। এর পাশাপাশি দলের বর্তমান অবস্থান নারী অধিকার বিরোধী এবং চরম রক্ষণশীল ভাবধারার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। দলীয় আনুষ্ঠানিক কাউন্সিল ছাড়াই নতুন কমিটি গঠন করার বিষয়েও তার তীব্র আপত্তি ছিল।

সামান্তা শারমিন জানান, দলের এই আদর্শিক বিচ্যুতিগুলো নিয়ে তিনি বারবার শীর্ষ নেতৃত্বকে সতর্ক করেছিলেন এবং সিদ্ধান্তগুলো পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু এনসিপি তাদের বর্তমান রাজনৈতিক গতিপথ থেকে সরে আসতে রাজি হয়নি। মূলত আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত ডিসেম্বরে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির আনুষ্ঠানিক জোট গঠনের পর থেকেই তিনি দলীয় কর্মকাণ্ডে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। তার ক্রমাগত পরামর্শ উপেক্ষিত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে তিনি পদত্যাগের পথ বেছে নেন এবং দলীয় অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ গ্রুপেও সবাইকে বিষয়টি অবগত করেন।

ফেসবুকে দেওয়া লেখায় তিনি গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, দেশের আপামর মানুষ তরুণদের সমর্থন করেছিল একটি সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের আশায়। মানুষের প্রত্যাশা ছিল, তরুণেরা পুরনো ক্ষমতার অপব্যবহারের পুনরাবৃত্তি না করে একটি নতুন গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলবে। কিন্তু নারী-পুরুষের সমান অধিকার, অর্থনৈতিক সুবিচার, দেশের সার্বভৌমত্ব এবং প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো এখনো একটি সঠিক ও নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের অপেক্ষায় রয়ে গেছে।

বর্তমান তরুণ প্রজন্মের সামনে প্রধান রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জটি তুলে ধরে তিনি জানান, শুধু নতুন নামের একটি দল গঠন করলেই হবে না, বরং এমন একটি রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে হবে যেখানে মতপার্থক্য থাকলেও তা যেন বিভেদের হাতিয়ার না হয়। আদর্শিক ভিন্নতা থাকলেও তা যেন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত না করে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থের চেয়ে অন্য কোনো বিদেশি শক্তি যেন প্রাধান্য না পায়। অতীত রাজনীতির অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং বাংলাদেশের একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের জন্য যারা কাজ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তাদের সবাইকে একত্রিত হওয়ার এবং এই বিষয়ে ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন সামান্তা শারমিন।