এশিয়ায় জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা এবং আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে সিঙ্গাপুরে মাটির নিচে অপরিশোধিত তেল মজুতের পরিকল্পনা করেছে সৌদি আরব। ২০২৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে সিঙ্গাপুরের জুরং রক ক্যাভার্নসে এই তেল সংরক্ষণ করা হবে। সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুই দেশের জ্বালানিমন্ত্রীরা এ পরিকল্পনার কথা জানান।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে এশিয়ায় জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এতে বিভিন্ন দেশ নিজেদের তেলের মজুত থেকে সরবরাহ নিতে বাধ্য হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত থাকা নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে। যুদ্ধের আগে এশিয়ার আমদানি করা তেলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসত।
সিঙ্গাপুরের জ্বালানি, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী তান সি লেং সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক জ্বালানি সপ্তাহের সম্মেলনে বলেন, ২০২৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে জুরং রক ক্যাভার্নসে সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল মজুতের ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে দুই দেশ যৌথভাবে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
তিনি বলেন, এই উদ্যোগ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সৌদি অপরিশোধিত তেলের সরবরাহব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করবে। একই সঙ্গে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে সিঙ্গাপুরের জ্বালানি নিরাপত্তা ও সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে।
তান সি লেং জানান, সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো সোমবার সিঙ্গাপুরের এনার্জি মার্কেট অথরিটি এবং জেটিসি করপোরেশনের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করবে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা চূড়ান্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
সম্মেলনে ভিডিওবার্তায় সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুলআজিজ বিন সালমান আল-সৌদ বলেন, এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোর কাছাকাছি তেলের সরবরাহ নিয়ে আসা গেলে সরবরাহ নেটওয়ার্কের নমনীয়তা বাড়বে। পাশাপাশি সিঙ্গাপুরের জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী হবে।
জুরং রক ক্যাভার্ন সিঙ্গাপুরের জুরং দ্বীপে অবস্থিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম ও বৃহত্তম ভূগর্ভস্থ বাণিজ্যিক তরল তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল সংরক্ষণাগার। মাটির গভীরে পাথর কেটে তৈরি বিশাল কৃত্রিম গুহার মতো এই স্থাপনায় অপরিশোধিত তেল ও বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি সংরক্ষণ করা হয়।
ভূগর্ভের প্রায় ১৫০ মিটার বা ৪৯২ ফুট গভীরে অবস্থিত এই সংরক্ষণাগারে সর্বোচ্চ ১৪ লাখ ৭০ হাজার ঘনমিটার তরল হাইড্রোকার্বন মজুত করা যায়। অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেটের মতো জ্বালানি সংরক্ষণের জন্য নির্মিত স্থাপনাটির ধারণক্ষমতা প্রায় ৯০ লাখ ব্যারেল।
বর্তমানে সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় অপরিশোধিত তেল মজুত করে। অপ্রত্যাশিতভাবে তেলের ঘাটতি দেখা দিলে এসব মজুত থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকার অগ্রাধিকার পায়।
জাপানের ওকিনাওয়ায় তেল মজুতের সক্ষমতা ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে বাড়িয়ে ৮২ লাখ ব্যারেল করা হয়। সৌদি আরামকোর জাপানের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশটির তেল, গ্যাস ও ধাতুবিষয়ক জাতীয় সংস্থা জোগমেকের (JOGMEC) সঙ্গে চুক্তির আওতায় এই সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছিল।
এ ছাড়া, ২০২৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা কোরিয়া ন্যাশনাল অয়েল করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তি করে সৌদি আরামকো। চুক্তি অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার উলসান বন্দরের সংরক্ষণাগারে পাঁচ বছরের জন্য ৫৩ লাখ ব্যারেল তেল মজুত করা হবে।
এদিকে, এশিয়াজুড়ে অপরিশোধিত তেলের মজুত বাড়াতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে জাপান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি চলতি বছরের শুরুতে ‘পার্টনারশিপ ইন ওয়াইড এনার্জি অ্যান্ড রিসোর্সেস রেজিলিয়েন্স এশিয়া’ বা ‘পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের প্রস্তাব দেন। এই উদ্যোগের আওতায় ১০ বিলিয়ন বা ১ হাজার কোটি ডলারের আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া ইতিমধ্যে বিপুল পরিমাণ তেলের মজুত গড়ে তুলেছে। তবে এশিয়ার অন্য বেশির ভাগ দেশের তেলের মজুত তুলনামূলকভাবে কম। ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহে আকস্মিক বিঘ্ন দেখা দিলে এসব দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা সীমিত হতে পারে।