শুক্রবার, 25 সেপ্টেম্বর 2026
সকল বিভাগ

ফাইভারে বিটোপিয়ার কারসাজি, চাপে দেশের ফ্রিল্যান্সিং খাত

জুলাই মাসের শেষ ভাগে সংস্থাটির সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত প্রায় তিন শত ফাইভার প্রোফাইল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মাধ্যমে আরও জানা যায়, এই ধারাবাহিকতায় তাদের আরও কয়েক সহস্রাধিক প্রোফাইল বর্তমানে নিবিড় পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সাধারণ স্বাধীন কর্মীদের প্রতি সার্বিক নজরদারি ও কড়াকড়ি বৃদ্ধি পাওয়ার তীব্র আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

ফাইভারে বিটোপিয়ার কারসাজি, চাপে দেশের ফ্রিল্যান্সিং খাত
বিশ্বখ্যাত উন্মুক্ত ফ্রিল্যান্সিং মাধ্যম ফাইভারকে কেন্দ্র করে দেশীয় তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা বিটোপিয়া গ্রুপের বিরুদ্ধে নানামুখী অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিজস্ব কর্মীদের সরকারি পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের প্রতিলিপি হাতিয়ে নিয়ে প্রোফাইল তৈরি, সেগুলোর ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব স্থাপন, বানোয়াট ক্রয়াদেশের মাধ্যমে অন্য স্বাধীন কর্মীদের অবস্থান নিচে নামানো এবং প্ল্যাটফর্মের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত করার মতো গুরুতর বিষয় প্রকাশ্যে এসেছে।

জুলাই মাসের শেষ ভাগে সংস্থাটির সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত প্রায় তিন শত ফাইভার প্রোফাইল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মাধ্যমে আরও জানা যায়, এই ধারাবাহিকতায় তাদের আরও কয়েক সহস্রাধিক প্রোফাইল বর্তমানে নিবিড় পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সাধারণ স্বাধীন কর্মীদের প্রতি সার্বিক নজরদারি ও কড়াকড়ি বৃদ্ধি পাওয়ার তীব্র আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

আগস্টের চার তারিখে ফাইভারের স্থানীয় ফোরামে একটি আনুষ্ঠানিক সতর্কবার্তা প্রচার করা হয়। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়, অন্যের নামে প্ল্যাটফর্মে প্রোফাইল খোলা ও তা নেপথ্য থেকে পরিচালনা করা এবং সাজানো কাজ ও মন্তব্যের সাহায্যে অবস্থান পরিবর্তনের অপচেষ্টা শনাক্ত করা হয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রমাণ মেলায় নিয়মভঙ্গকারী সেসব প্রোফাইলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া এবং সেগুলোর অবস্থান তলানিতে নামিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর কথাও ওই বার্তায় উল্লেখ থাকে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানে যোগদানের সময়েই কর্মীদের জাতীয় পরিচয়পত্র এবং পাসপোর্টের সংবেদনশীল নথিপত্র সংগ্রহ করা হতো। পরবর্তীতে সেগুলো দিয়েই ফাইভারে বিভিন্ন প্রোফাইল সক্রিয় করা হলেও কর্মীরা সেগুলো নিজে তদারকি করতে পারতেন না, বরং সামগ্রিক কর্তৃত্ব কুক্ষিগত করে রাখত করপোরেট ব্যবস্থাপনা। এমনকি কর্মস্থল ত্যাগ করার পরেও অনেকে নিজ নামে চালু থাকা এসব প্রোফাইলের নিয়ন্ত্রণ ফেরত পাননি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাবেক কর্মীরা।

আন্তর্জাতিক এই প্ল্যাটফর্মের বিধিমালার পরিপন্থী হলো কারও ব্যক্তিগত পরিচয় ব্যবহার করে বিকল্প প্রোফাইল খোলা কিংবা অন্যের হয়ে কাজ পরিচালনা করা। একই সঙ্গে একাধিক প্রোফাইল ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে কাজের পরিবেশ নষ্ট করার বিষয়টিকেও গুরুতর নিয়মভঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষ।

এর বাইরেও অন্য স্বাধীন কর্মীদের কাজের তালিকাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে কৃত্রিম ক্রয়াদেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী এক মুক্তপেশাজীবী জানান, ওই সংস্থার আওতাধীন একটি প্রোফাইল থেকে প্রথমে তাঁর কাজে ফরমাশ দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তা ইচ্ছাকৃতভাবে বাতিল করা হয়, যার একমাত্র লক্ষ্য ছিল তাঁর কাজের দৃশ্যমানতা নিচে নামিয়ে দেওয়া। পরবর্তী অনুসন্ধানে তিনি জানতে পারেন, ওই প্রোফাইলটির সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন বিটোপিয়া সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিরা, যা তিনি জনসমক্ষেও তুলে ধরেছিলেন।

প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, উদ্যোগটি পূর্বে বিডিকলিং আইটি নামে পরিচিত থাকলেও পরবর্তীতে বিটোপিয়া গ্রুপ হিসেবে নতুন করে আত্মপ্রকাশ করে। এরপর স্পার্কটেক, সফটভেন্স, এসএম টেকনোলজি, জেভিএআই কিংবা ফায়ার এআই-এর মতো বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের ব্যানারে জনবল নিযুক্ত করা হতে থাকে। নিজেদের ওয়েবসাইটে তারা প্রায় বাইশটি সহায়ক প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করেছে।

কেবল প্ল্যাটফর্মের নীতিমালা লঙ্ঘনই নয়, প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীর আচরণ ও অভ্যন্তরীণ কর্মপরিবেশ নিয়েও বহু অভিযোগ রয়েছে। কর্মীদের যথাসময়ে পারিশ্রমিক ও চূড়ান্ত দেনা পরিশোধ না করা, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই ছাঁটাই, দীর্ঘ কর্মঘণ্টায় বাধ্য করা এবং ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে মানসিক চাপ সৃষ্টির অভিযোগ তুলেছেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক কর্মীদের অনেকে।

বর্তমানে দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠী আন্তর্জাতিক মুক্তপেশা থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে নিয়ে আসছেন। এই বাস্তবতায় কোনো নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক চক্রের বিরুদ্ধে এ ধরনের পরিকল্পিত অনিয়মের সত্যতা মিললে তার নেতিবাচক প্রভাব কেবল ওই সংস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং সামগ্রিকভাবে দেশীয় দক্ষ মুক্তপেশাজীবীদের প্রতিটি প্রোফাইল অতিরিক্ত যাচাই-বাছাই ও অবিশ্বাসের মুখে পড়বে, যা জাতীয় পর্যায়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বিকাশমান সম্ভাবনাকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলবে।