শুক্রবার, 6 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

ইরানে মার্কিন হামলায় যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ার দাবি জাতিসংঘের

ইরানের দক্ষিণের শহর মিনাবের শাজারেহ তাইয়েবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং লামের্দ এলাকার একটি ক্রীড়া চত্বরে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ফলে বিপুল প্রাণহানি ও নাগরিক স্থাপনার অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং সম্পূর্ণ বেপরোয়া আক্রমণের শামিল।

ইরানে মার্কিন হামলায় যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ার দাবি জাতিসংঘের
ছবি : সংগৃহীত

ইরানের ভূখণ্ডে পরিচালিত দুটি পৃথক সামরিক অভিযানে অন্তত ১৭৭ জন সাধারণ নাগরিকের প্রাণহানির ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধাপরাধে জড়িত ছিল বলে জোরালো প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেছে জাতিসংঘের স্বাধীন তথ্যানুসন্ধান দল। 

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ প্যানেল জানিয়েছে, ইরানের দক্ষিণের শহর মিনাবের শাজারেহ তাইয়েবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং লামের্দ এলাকার একটি ক্রীড়া চত্বরে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ফলে বিপুল প্রাণহানি ও নাগরিক স্থাপনার অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং সম্পূর্ণ বেপরোয়া আক্রমণের শামিল।

প্রতিবেদনে গত ২৮ ফেব্রুয়ারির প্রেক্ষাপট তুলে ধরে উল্লেখ করা হয়, ইরান লক্ষ্য করে মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ অভিযান সূচনার দিনেই মিনাবের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে শক্তিশালী টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত হানা হয়। স্থানীয় প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, সেই ধ্বংসযজ্ঞে প্রাণ হারান অন্তত ১৫৬ জন, যার ভেতর ১২০ জনই ছিল কোমলমতি শিক্ষার্থী।

তদন্তকারীদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভবনটি ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌঘাঁটির কাছাকাছি হলেও তা যে স্রেফ সাধারণ বিদ্যালয় ছিল, বাইরে থেকে তা স্পষ্টতই চেনা যেত এবং সেখানে কোনো ধরনের সামরিক তৎপরতার হদিস মেলেনি। বেঁচে ফেরা প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটিতে দফায় দফায় দুবার রকেট আঘাত হানে। এতে প্রমাণিত হয় লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে নয়, বরং বিদ্যাপীঠটিকে জেনেশুনেই নিশানায় পরিণত করা হয়েছিল। যেহেতু টমাহক অস্ত্রের একক নিয়ন্ত্রণ ওয়াশিংটনের হাতে, তাই আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান দল এই ধ্বংসাত্মক হামলার দায় পেন্টাগনের ওপরেই চাপিয়েছে।

একই তারিখে লামের্দ শহরের ক্রীড়াকেন্দ্র ও সংলগ্ন আবাসিক জনপদে প্রিসিশন স্ট্রাইক ক্ষেপণাস্ত্র থেকে ক্ষতিকর টাংস্টেন ছররা বর্ষণ করা হলে আরও ২১ জন নিরীহ মানুষের মৃত্যু ঘটে, যার মধ্যে সাতটি শিশুও ছিল। সংশ্লিষ্ট প্যানেলের ভাষ্য, এ ধরনের উন্নত প্রযুক্তিবিশিষ্ট পিআরএসএম অস্ত্র একমাত্র মার্কিন বাহিনীর হস্তগত এবং কোনো সামরিক কারণ ছাড়াই সাধারণ মানুষের এলাকায় তা প্রয়োগ করা হয়েছে।

শুরু থেকেই ওয়াশিংটন লামের্দে কোনো অভিযান চালানোর কথা অস্বীকার করে আসছে। মিনাবের মর্মান্তিক ঘটনার বিষয়ে নিজেদের পক্ষ থেকে অভ্যন্তরীণ যাচাইয়ের কথা জানালেও এখনো পর্যন্ত তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণী আনুষ্ঠানিকভাবে জনসমক্ষে আনেনি তারা। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র ইঙ্গিত দিয়েছেন, বৈশ্বিক সংস্থার এই অনুসন্ধানকে কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না তাদের দেশ। অন্যদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের দাবি, বেসামরিক জানমালের ক্ষতিসাধন তাদের সামরিক নীতিবিরুদ্ধ।

একই নথিতে কেবল মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধেই নয়, অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ দমনে ইরানি প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও মানবতাবিরোধী অপরাধের মারাত্মক অভিযোগ আনা হয়েছে। গত বছরের শেষভাগে ও চলতি বছরের শুরুতে ইরানজুড়ে তীব্র সরকারবিরোধী আন্দোলন চলাকালে দেশটির আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো অভাবনীয় নিষ্ঠুরতা চালিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। দেশটির ৩১টি প্রদেশেই বিক্ষোভকারীদের রুখতে নির্বিচারে প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার, ভবনের ছাদ থেকে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল দিয়ে নিশানা করা এবং ধাতব ছররা নিক্ষেপ করে বহু মানুষকে অন্ধ করে দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া আহতদের চিকিৎসা ব্যাহত করতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চড়াও হওয়া এবং চিকিৎসাসেবার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আটকের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্রও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।