ইয়েমেনের সশস্ত্র সংগঠন হুতিদের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা রুখতে বিশ্বমঞ্চের প্রভাবশালী অংশীদারদের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত আন্তর্জাতিক মৈত্রী গঠনের জোর তাগিদ দিয়েছেন এক ইসরায়েলি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
তিনি সতর্কবার্তা দিয়ে উল্লেখ করেছেন, বৈশ্বিক পর্যায়ে এই ধরনের প্রতিরোধমূলক ঐক্য গড়ে তুলতে ব্যর্থ হলে ভূকৌশলগতভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বাব এল-মান্দেব প্রণালির নৌ চলাচলে চরম বিশৃঙ্খলা নেমে আসতে পারে। তেলআবিবের সরকারি সম্প্রচার সংস্থা কানের বরাতে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এই তথ্য প্রকাশ্যে এনেছে।
জলপথটির পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বিদ্রোহীদের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তেলআবিবের নিরাপত্তা মহলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হলেও সরাসরি কোনো বড় ধরনের সামরিক অভিযানে একক নেতৃত্ব না দেওয়ার বিষয়ে নিজ সরকারকে সতর্ক করেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, বিশ্বের অন্যতম জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত এই সামুদ্রিক রুটের নিরাপত্তা বজায় রাখতে অবিলম্বে একটি আন্তর্জাতিক বলয় তৈরি করা প্রয়োজন। গত সপ্তাহে প্রণালিটির কর্তৃত্ব নিজেদের কব্জায় নেওয়ার বিষয়ে হুতিদের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর বহুপাক্ষিক উদ্যোগ ছাড়া আর কোনো ফলপ্রসূ পথ খোলা নেই বলেই মনে করছে তেলআবিব।
এশিয়া ও আফ্রিকার জলসীমা সংযোগকারী এই গুরুত্বপূর্ণ পথ দিয়ে নিয়মিত ইসরায়েলগামী পণ্যবাহী নৌযানসহ শত শত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ যাতায়াত করে। অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ বিদ্রোহীদের হাতে থাকায় আধুনিক উপকূলীয় নজরদারি বা ক্ষেপণাস্ত্রের অভাব থাকলেও বিস্ফোরকবোঝাই দ্রুতগামী জলযান কিংবা রকেটের সাধারণ আক্রমণেই এই পথ পুরোপুরি অচল করে দেওয়ার সামর্থ্য রয়েছে তাদের। আপাতত ইয়েমেনের অভ্যন্তরে সরাসরি সংঘাতে না জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে নেপথ্য কূটনীতি চালিয়ে যাওয়ার পথেই রয়েছে তেলআবিব।
ইসরায়েলি প্রভাবশালী গণমাধ্যম হারেৎজের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দেশের শীর্ষ সামরিক কর্তৃপক্ষ হুতিদের তৎপরতাকে শুধু নিজেদের একক সংকট হিসেবে না দেখে বরং এটি একটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক হুমকি হিসেবে বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি রুদ্ধদ্বার সামরিক পর্যালোচনায় এই অভিমত উঠে আসে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ মোকা বন্দর এলাকা এবং বাব এল-মান্দেবের নিকটবর্তী একাধিক কৌশলগত অবস্থান থেকে সৌদি-সমর্থিত সরকারি সেনাদের প্রত্যাহারের সুযোগে হানিশ দ্বীপপুঞ্জ ও পেরিম দ্বীপের মতো স্পর্শকাতর এলাকাগুলো বিদ্রোহীরা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরেই এই উদ্বেগ তীব্র আকার ধারণ করে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা, আন্তর্জাতিক একটি সমন্বিত জোট গঠিত হলে হুতিদের পেছনে থাকা ইরানি মদদের বিষয়টি বিশ্বপর্যায়ে জোরালোভাবে সামনে আনা সম্ভব হবে। এর ফলে ইসরায়েল আরেকটি বহুমুখী যুদ্ধের সরাসরি সেনাপতিত্ব এড়াতে পারবে এবং লোহিত সাগরের বাণিজ্যিক স্বার্থের সাথে জড়িত সৌদি আরব ও মিসরের মতো আঞ্চলিক পক্ষগুলোও আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে বাধ্য হবে। বিশেষত সুয়েজ খাল দিয়ে পণ্য পরিবহন কমে যাওয়ায় কায়রোর রাজস্ব ঘাটতির আশঙ্কা এবং রিয়াদের নিরাপত্তাহীনতা আন্তর্জাতিক এই প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স প্রকাশ করেছে যে, সৌদি প্রশাসন সরাসরি মার্কিন সামরিক অভিযান আশা করলেও ওয়াশিংটন বর্তমানে গোয়েন্দা নজরদারির সহায়তার মধ্যেই নিজেদের সীমিত রেখেছে।
এদিকে সৌদি আরবের কিং খালিদ বিমানঘাঁটি এবং আরামকোর অবকাঠামো লক্ষ্য করে নতুন করে ড্রোন ও রকেট ছুড়ছে হুতিরা। এর আগে গাজা উপত্যকায় আগ্রাসন শুরুর পর থেকে ইসরায়েলও ইয়েমেনের বিভিন্ন বন্দর ও জ্বালানি ক্ষেত্রে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়ে আসছিল। ফিলিস্তিনিদের ওপর অবরোধের প্রতিবাদ হিসেবে শুরু থেকেই লোহিত সাগরে ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে আসছে সশস্ত্র এই গোষ্ঠী। তবে বিচ্ছিন্ন কিছু বিমান হামলায় দীর্ঘমেয়াদি নৌনিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব বলে মনে করছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর। ফলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একক নেতৃত্বমূলক সামরিক অবস্থানের বিপরীতে গিয়ে দেশটির নিরাপত্তা নীতিনির্ধারকেরা এখন এমন এক বহুপাক্ষিক জোটের ওপর আস্থা রাখতে চাইছেন, যার সম্মুখ নেতৃত্বে তেলআবিবের সরাসরি উপস্থিতি থাকবে না।