যুক্তরাজ্যের সুবিশাল আমদানিশিল্পে বাংলাদেশের বর্তমান হিস্যা শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে মাত্র এক শতাংশে রূপান্তর করা গেলে দেশটিতে বার্ষিক রপ্তানি আয় অনায়াসেই এক হাজার কোটি বা দশ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা।
বুধবার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাকক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ সেমিনারে অর্থনীতিবিদ ও বাণিজ্য বিশ্লেষকরা এই সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তৈরি পোশাকশিল্পের বাইরে অন্যান্য সম্ভাবনাময় পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের উপায় নিয়ে যৌথভাবে এই আলোচনার আয়োজন করে ডিসিসিআই, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো এবং যুক্তরাজ্য হাইকমিশন। আলোচকরা জোর দিয়ে বলেন, বিশাল এই আর্থিক লক্ষ্য পূরণ করতে হলে পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, বৈশ্বিক গুণগত মান ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন মেনে চলা এবং বিদ্যমান শুল্ক ও অশুল্ক সংক্রান্ত যাবতীয় জটিলতা দূর করা একান্ত প্রয়োজন।
কর্মশালায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, ব্রিটিশ বাজারে বাংলাদেশের বাণিজ্যের সিংহভাগই এককভাবে তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল। এই উচ্চঝুঁকিপূর্ণ পরনির্ভরশীলতা হ্রাস করে ওষুধ, হিমায়িত মৎস্য ও চিংড়ি, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, কৃষিভিত্তিক পণ্যসামগ্রী, বাইসাইকেল, হালকা প্রকৌশল ও প্লাস্টিকের মতো সম্ভাবনাময় অপ্রচলিত খাতগুলোকে দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য ঘোষিত ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ট্রেডিং স্কিম বা ডিসিটিএস সুবিধার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে রপ্তানিকারকদের এখনই কৌশলগত প্রস্তুতি গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়।
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ উল্লেখ করেন, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বেশ সুদৃঢ় হলেও পণ্যের বৈচিত্র্যহীনতা এখনও বড় সীমাবদ্ধতা। এই অচলাবস্থা কাটাতে দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের পণ্যের মানোন্নয়ন, বৈশ্বিক সনদায়ন, কাঁচামালের উৎস ও সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং ব্র্যান্ডিং ও মোড়কজাতকরণে আন্তর্জাতিক দক্ষতা অর্জনের বিকল্প নেই। তিনি যুক্তরাজ্যের বাজারসংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ, বৈশ্বিক শর্ত পরিপালন এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণে বিদ্যমান শুল্ক ও অশুল্ক বাধা অপসারণে তৎপর হওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার জেমস গোল্ডম্যান বলেন, উভয় দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক সখ্য রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশে চূড়ান্ত উত্তরণের পরও বাংলাদেশের জন্য ব্রিটিশ বাজারের উন্মুক্ত সুযোগগুলো কাজে লাগাতে দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা এবং নতুন বিনিয়োগ নিয়ে প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান আরিফ পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান, সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার, যার চুরানব্বই শতাংশই এসেছে এককভাবে তৈরি পোশাক খাত থেকে। অথচ যুক্তরাজ্য বছরে মোট প্রায় ৯৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে থাকে, যার মধ্যে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনও শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশেই আটকে রয়েছে। এই বাজার হিস্যা মাত্র এক শতাংশে নিয়ে যেতে পারলেই দেশের আয় দশ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো বাস্তবসম্মত। তবে এ জন্য কেবল নির্দিষ্ট একটি খাতের মুখাপেক্ষী না থেকে মাঝারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুবিধা বৃদ্ধি, ভ্যালু চেইন উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।