শুক্রবার, 16 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

আন্তর্জাতিক সংকট ও সরবরাহ ঘাটতিতে দেশের বাজারে বাড়ছে এলপিজির দাম

বর্তমান অস্থিরতার পেছনে দেশীয় ও বৈশ্বিক বহুমুখী প্রতিকূলতা দায়ী।

আন্তর্জাতিক সংকট ও সরবরাহ ঘাটতিতে দেশের বাজারে বাড়ছে এলপিজির দাম
সারাদেশের খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দরের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাড়তি টাকায় সিলিন্ডার বিক্রি হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত জোগানের অভাবে অনেক স্থানে সাধারণ ভোক্তারা চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার সংগ্রহ করতে পারছেন না।

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান অস্থিরতার পেছনে দেশীয় ও বৈশ্বিক বহুমুখী প্রতিকূলতা দায়ী। বিশ্ববাজারে এলপিজির দরবৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক নৌপথে জাহাজ ভাড়ার উল্লম্ফন এবং পরিবহন সংক্রান্ত জটিলতায় দেশে পণ্যটি আমদানির ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে অভ্যন্তরীণ বাজারে।

বাজারের শীর্ষস্থানীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসায় গত কয়েক বছরে বিপুলসংখ্যক ভোক্তা পুরোপুরি সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এ কারণে স্থানীয় পর্যায়ে চাহিদা বেড়েছে কয়েক গুণ। এছাড়া অতীতে নিয়মিত এলপিজি আমদানি করত এমন দুই-একটি বড় কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামগ্রিক বাজারে সরবরাহের তীব্র টানাপোড়েন শুরু হয়েছে।

বিইআরসি প্রতি মাসে এলপিজির খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দেয় এবং মূল বিপণনকারী কোম্পানিগুলোর দাবি, তারা সরকারি নির্ধারিত দরেই পরিবেশকদের কাছে পণ্য সরবরাহ করে থাকে। তাদের ক্রয়-বিক্রয়ের যাবতীয় নথিপত্র যেকোনো সময় নিরীক্ষাযোগ্য। তবে স্থানীয় বাজারে তীব্র ঘাটতি থাকায় খুচরা বিক্রেতারা ইচ্ছেমতো দর বাড়িয়ে নিচ্ছেন, যার ফলে পাইকারি দরের তুলনায় কোনো কোনো এলাকায় সিলিন্ডারপ্রতি চারশত টাকারও বেশি বাড়তি গুনতে হচ্ছে সাধারণ ক্রেতাদের। যদিও এই দায় অনেকে প্রধান কোম্পানিগুলোর ওপর চাপান, তবে খুচরা পর্যায় তদারকির জন্য সরকারের একাধিক নজরদারি সংস্থা রয়েছে।

ওমেরা এলপিজির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মাথেন্দ্র ডি যয়োশা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি, ঋণপত্র বা আমদানিতে ব্যাংকিং জটিলতা সত্ত্বেও তাদের প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিক আমদানি সচল রেখেছে। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের বেশ কয়েকটি বড় অপারেটর অর্থায়ন সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতায় নিয়মিত এলপিজি আনতে না পারায় বাজারে জোগানের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। অন্যান্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সংকটে পড়ায় ওমেরার ওপর অতিরিক্ত ক্রেতার চাপ সৃষ্টি হয়েছে। গত অক্টোবরে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বারো কেজির সিলিন্ডারের দর এক হাজার আটশত সাঁইত্রিশ টাকা বেঁধে দিলেও খুচরা দোকানে অতিরিক্ত দামে বিক্রির বিষয়টি জনমনে অসন্তোষ তৈরি করেছে। তিনি মনে করেন, অননুমোদিত দরবৃদ্ধি ঠেকাতে সরকারি নজরদারির পাশাপাশি ব্যাংক, আমদানিকারক ও পরিবেশকদের একযোগে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

অপর শীর্ষ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আইগ্যাস কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের আমদানি ও বিক্রির প্রতিটি হিসাব সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং যাচাইযোগ্য। কোম্পানিটি জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ অন্য রুটে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় এশীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে জ্বালানি পৌঁছাতে বাড়তি প্রিমিয়াম গুনতে হচ্ছে। বাজার দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধাবস্থা শান্ত হওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ব্যবস্থা পূর্বাবস্থায় ফিরে আসার ওপরই নির্ভর করছে সামগ্রিক সরবরাহ পরিস্থিতির স্থায়িত্ব।