শনিবার, 7 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

জরুরি ওষুধের দাম সাধারণ রোগীর সাধ্যের মধ্যে রাখা দরকার

প্রয়োজনীয় সারের মতো জীবনরক্ষাকারী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ভেতরে রাখা জরুরি।

জরুরি ওষুধের দাম সাধারণ রোগীর সাধ্যের মধ্যে রাখা দরকার

প্রয়োজনীয় সারের মতো জীবনরক্ষাকারী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ভেতরে রাখা জরুরি।

এজন্য কেবল দর নির্ধারণ নয়, বরং প্রস্তুতকরণ খরচ, ন্যায্য মুনাফা, বাজার প্রতিযোগিতা এবং কার্যকর তদারকির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা আবশ্যক বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, আইনজ্ঞ ও ওষুধ শিল্পের শীর্ষ প্রতিনিধিরা। সেই সাথে প্রতি দুই বছর অন্তর জরুরি ওষুধের তালিকা পুনর্বিবেচনা ও আধুনিকায়নের ওপর তাগিদ দিয়েছেন তারা।


মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘রোগীর নাগালে ওষুধ, উৎপাদকের টেকসইতা: ভারসাম্যপূর্ণ ওষুধনীতির সন্ধানে’ শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা তুলে ধরেন। পাবলিক ইন্টেগ্রিটি নেটওয়ার্ক ফর এভিডেন্স অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সি (পাইনেট) আয়োজিত এই সংলাপে অংশ নেন স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সংসদ সদস্য, পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধি, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।

আলোচকরা উল্লেখ করেন, গত ৩ আগস্ট সরকার জরুরি ওষুধের সম্পূর্ণ তালিকা বাতিল করেছে, যা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। তালিকায় কোনো ভুলত্রুটি থাকলে তা পরিমার্জনের সুযোগ থাকে। পুরো তালিকা বাতিল না করে চিকিৎসা পদ্ধতির পরিবর্তন, বৈজ্ঞানিক তথ্য ও ব্যাধির ধরন বিবেচনায় নিয়মিত তালিকা আধুনিকায়ন দরকার। এছাড়া উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি দুই বছর পর মূল্যের সমন্বয় করা প্রয়োজন।

সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ। তিনি জানান, ওষুধমূল্য নির্ধারণের কাঠামোটি মূলত ১৯৮২ সালের পুরনো নিয়মে পরিচালিত। কিন্তু বর্তমানে পরিবহন, কাঁচামাল আমদানি, বিদ্যুৎ ও গবেষণার খরচ অনেকটাই বেড়েছে। ফলে পুরনো নিয়মে দর অপরিবর্তিত রাখলে শিল্প খাত ক্ষতির মুখে পড়বে। তাই ভোক্তা ও উৎপাদক উভয়পক্ষের কথা ভেবে নতুন নীতি তৈরি করা প্রয়োজন।

প্রতিবেশী ভারতের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানে স্বাধীন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নিয়মিত সমন্বয় করা হয়। বাংলাদেশেও ওষুধ প্রশাসনের বাইরে পৃথক একটি নিরপেক্ষ দর নিয়ন্ত্রণ সংস্থা গঠন করা যেতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ডা. মামুনুর রহমান মালিক জানান, এসেনশিয়াল ড্রাগস তালিকা কোনো স্থায়ী বিষয় নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তালিকায় অসংখ্য ওষুধ যুক্ত হলেও তা নিয়মিত হালনাগাদ হচ্ছে না।

সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী শিশির মনির জানান, ২০২৩ সালের আইনে জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শে প্রতি দুই বছরে তালিকা পরিমার্জনের নিয়ম রয়েছে। কিন্তু ২০২৬ সালের তালিকা তৈরিতে আলাদা টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত আইনি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সহ-সভাপতি ও রেনাটা পিএলসির নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ এস কায়সার কবির সতর্ক করে বলেন, ক্যানসারের মতো কঠিন ব্যাধির ওষুধের মূল্য হঠাৎ কমিয়ে দিলে স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অথচ দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশ থেকে আসা ওষুধের চেয়ে অনেক কম মূল্যে সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ খান ওষুধ প্রশাসনকে আরও দক্ষ ও শক্তিশালী করার তাগিদ দেন। সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দীন ফরিদ বলেন, মেধাস্বত্ব আইনের কারণে ভবিষ্যতে ওষুধ খরচ বাড়তে পারে, যা মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি চাই।

স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের নির্বাহী পরিচালক মো. মিজানুর রহমান উল্লেখ করেন, দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ ওষুধ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। ঢালাওভাবে দাম কমানোর সিদ্ধান্ত দেশীয় উৎপাদনকে ব্যাহত করতে পারে।

ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেন ওষুধের মান, অনৈতিক বাজারজাতকরণ রোধ এবং সঠিক ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।