পাক ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সুস্বাস্থ্য ও কারাগারে সঠিক চিকিৎসার মানবিক নিশ্চয়তা চেয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের কাছে খোলা চিঠি পাঠিয়েছেন বিশ্ব ক্রিকেটের বিশিষ্ট তারকাগণ।
ভারতের কপিল দেব ও সুনীল গাভাস্কার সহ বিশ্বের মোট ২১ জন কিংবদন্তি আন্তর্জাতিক অধিনায়ক যৌথভাবে এই আবেদন পেশ করেছেন।
সদ্য প্রকাশিত এই যৌথ বার্তায় প্রবীণ এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বর্তমান স্বাস্থ্যগত অবস্থা নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠা ব্যক্ত করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া সুস্পষ্ট নির্দেশনা অমান্য করে তাঁর চিকিৎসায় অবহেলা করা হয়েছে—সংবাদমাধ্যমে এমন তথ্য প্রকাশের পরেই মূলত এই উদ্যোগে শামিল হন সাবেক তারকারা।
১৯৯২ সালে আন্তর্জাতিক আসরে পাকিস্তানকে প্রথম শিরোপা এনে দেওয়া সাবেক এই তারকা রাজনৈতিক কারণে তিন বছরের বেশি সময় ধরে কারাবন্দি আছেন।
উল্লেখ্য, এর পূর্বেও ছয় মাস আগে বিশ্ব ক্রিকেটের ১৪ জন অধিনায়ক তাঁর ন্যায়সঙ্গত চিকিৎসার দাবিতে পাকিস্তান প্রশাসনের নিকট সচিত্র লিখিত আবেদন পেশ করেন। পরবর্তীতে আরও ৭ জন বিশিষ্ট তারকা যুক্ত হওয়ায় বর্তমানে স্বাক্ষরকারী ক্রীড়াবিদের সংখ্যা মোট ২১ জনে পৌঁছাল।
চিঠিতে বিশ্ব ক্রিকেটের এই তারকারা উল্লেখ করেছেন যে, কেবল সতীর্থ বা ক্রিকেট মাঠের পুরোনো প্রতিপক্ষ হিসেবে মানবিকতার খাতিরে তারা এই সংহতি প্রকাশ করছেন। এতে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই; বরং দীর্ঘদিনের শ্রদ্ধাবোধ ও খেলার মাঠে থাকা সুসম্পর্কের তাগিদেই সীমান্ত এবং রাষ্ট্রীয় বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে এই বৈশ্বিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
প্রেরিত পত্রে তুলে ধরা হয়, সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে সরকারি মেডিকেল বোর্ডের সাথে ইমরানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও পারিবারিক স্বজনদের উপস্থিতিতে হাসপাতালে একটি স্বাধীন পরীক্ষা চালানো হবে এবং কারাবিধি অনুযায়ী স্বজনদের সাথে সাক্ষাতের অনুমতি বলবৎ রাখা হবে।
সাবেক অধিনায়কেরা হতাশা প্রকাশ করে জানান, প্রাথমিক নির্দেশনার পর তাঁকে স্বল্প সময়ের জন্য হাসপাতালে নেওয়া হলেও ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের উপস্থিত হতে না দিয়ে তড়িঘড়ি করে কারাগারে ফেরত নেওয়া হয়েছে, যা আদালতের মৌলিক নীতিমালার পরিপন্থী। আদালতের প্রদত্ত প্রক্রিয়াকে পূর্ণাঙ্গ রূপ না দিয়ে আংশিকভাবে বাস্তবায়নের খবরে পরিবার ও আইনজীবীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
উক্ত চিঠিতে সাবেক অধিনায়কবৃন্দের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট তিনটি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। যার প্রথমেই রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের মূল প্রস্তাবনা মেনে স্বাধীন চিকিৎসা প্যানেলকে তাঁর স্বাস্থ্যের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া।
দ্বিতীয় দাবিতে আদালতের আগের আদেশ বহাল রেখে অনতিব্লিমে প্রতি সপ্তাহের নির্ধারিত পারিবারিক সাক্ষাতের সময়সূচি প্রশাসনিক বাধা ছাড়াই চালু রাখা।
আর শেষ দাবিতে বলা হয়, আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকদের প্রস্তাবিত ব্যবস্থাগুলো কালক্ষেপণ না করে দ্রুত প্রয়োগ করতে হবে।
সাক্ষরকারী ক্রীড়াবিদরা স্পষ্ট করেছেন যে তারা কোনোভাবেই পাকিস্তানের বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ কিংবা আইনগত বিষয়ে মন্তব্য করতে চান না। কিন্তু বিশেষ করে প্রবীণ এই তারকার ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি হ্রাস সংক্রান্ত খবরের প্রেক্ষাপটে একজন সিনিয়র নাগরিক ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াবিদ হিসেবে সুচিকিৎসা পাওয়ার অধিকার সুনিশ্চিত করার বিনীত অনুরোধ করেছেন।
বার্তায় আরও মনে করিয়ে দেওয়া হয়, ৭৩ বছর বয়সী ইমরান খান দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। তাঁর বিরুদ্ধে চলা নানা মামলা নিয়ে আইনি বা রাজনৈতিক তর্কবিতর্ক থাকলেও অন্তত একজন প্রবীণ মানুষ হিসেবে নিরপেক্ষ চিকিৎসাসেবা পাওয়া তাঁর মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। এটি কোনো রাজনৈতিক দাবি নয়, বরং একটি সর্বজনীন ও মানবিক আবেদন যা সকল ক্রীড়াপ্রেমী দেশ সমর্থন করবে বলে আশা করা যায়।
গুরুত্বপূর্ণ এই চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের তালিকায় রয়েছেন ইংল্যান্ডের বিখ্যাত অধিনায়ক মাইকেল আথারটন, স্যার অ্যালিস্টার কুক, ডেভিড গাওয়ার, নাসের হুসেইন ও স্যার অ্যান্ড্রু স্ট্রাউস।
অস্ট্রেলিয়ার ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের মধ্যে রয়েছেন অ্যালান বোর্ডার, গ্রেগ চ্যাপেল, ইয়ান চ্যাপেল, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট ও স্টিভ ওয়াহ।
ভারতের পক্ষে ১৯৮৩ সালের বিশ্বকাপ বিজয়ী অধিনায়ক কপিল দেব, কিংবদন্তি ব্যাটার সুনীল গাভাস্কার এবং সাবেক অধিনায়ক দিলীপ ভেংসরকার এই পদক্ষেপে সমর্থন জানিয়েছেন।
তাছাড়া স্বাক্ষর করা বিশ্বমানের এই ক্রিকেট তারকাদের তালিকায় আরও আছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্যার ক্লাইভ লয়েড, শ্রীলঙ্কার অর্জুনা রানাতুঙ্গা, নিউজিল্যান্ডের জন রাইট এবং নারী ক্রিকেটের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব বেলিন্ডা ক্লার্ক ও অ্যালেক্স ব্ল্যাকওয়েল।