মঙ্গলবার, 20 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে রাত ৮টায় দোকান বন্ধ: বিক্রি কমেছে ৩০% পর্যন্ত

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে রাত ৮টার মধ্যে দোকান, বাজার ও শপিং মল বন্ধ রাখার সরকারি নির্দেশনায় বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে জুতা, ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল পণ্যের ব্যবসায়ীরা বলছেন, সন্ধ্যার পর কেনাকাটার প্রবণতা বেশি থাকায় দোকান বন্ধের সময় কমে যাওয়ায় তাদের বিক্রি প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। অন্যদিকে দোকানভাড়া, কর্মীদের বেতনসহ পরিচালন ব্যয় কমেনি; বরং কিছু ক্ষেত্রে বেড়েছে।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে রাত ৮টায় দোকান বন্ধ: বিক্রি কমেছে ৩০% পর্যন্ত

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে রাত ৮টার মধ্যে দোকান, বাজার ও শপিং মল বন্ধ রাখার সরকারি নির্দেশনায় বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে জুতা, ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল পণ্যের ব্যবসায়ীরা বলছেন, সন্ধ্যার পর কেনাকাটার প্রবণতা বেশি থাকায় দোকান বন্ধের সময় কমে যাওয়ায় তাদের বিক্রি প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। অন্যদিকে দোকানভাড়া, কর্মীদের বেতনসহ পরিচালন ব্যয় কমেনি; বরং কিছু ক্ষেত্রে বেড়েছে।

বিদ্যুৎ সংকটের কারণে গত আগস্টে সারা দেশের দোকান, বাজার ও শপিং মল রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় সরকার। এর আগে রাত ১০টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার সুযোগ ছিল।

দীর্ঘদিন ধরে চলা মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। এর সঙ্গে কেনাকাটার সময় কমে যাওয়ায় বিক্রিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানান। তবে বিক্রি কমলেও দোকানভাড়া, কর্মীদের বেতনসহ অন্যান্য নির্দিষ্ট খরচ আগের মতোই রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব ব্যয় আরও বেড়েছে। ফলে আয় কমার পাশাপাশি মুনাফার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

ফ্যাশন ব্র্যান্ড কে ক্রাফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক খালিদ মাহমুদ খান বলেন, গত এক মাসে তাদের বিক্রি কমেছে এবং নগদ অর্থের প্রবাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে সাধারণত সূর্য ডোবার পর মানুষ কেনাকাটায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। বিশেষ করে গরমের সময় সন্ধ্যার পর কেনাকাটা করতেই বেশি পছন্দ করেন অনেকে। তাই দোকান খোলা রাখার সময় কমিয়ে দেওয়ায় দীর্ঘদিনের এই অভ্যাসে ব্যাঘাত ঘটছে।

খালিদ মাহমুদ খানের হিসাবে, মূল্যস্ফীতি ও কেনাকাটার সময় কমে যাওয়ার কারণে গত এক মাসে ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল পণ্যের বিক্রি প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে।

তিনি বলেন, খরচ বেড়েছে, কিন্তু আয় কমেছে। অথচ কর্মীদের বেতন ও দোকানভাড়া কমেনি।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্যোগের অংশ হিসেবে সরকার প্রথমে গত এপ্রিল মাসে দোকান, বাজার ও শপিং মল সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিল। ব্যবসায়ীদের চাপের পর তা পরিবর্তন করে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়।

ঈদুল আজহা উপলক্ষে সাময়িকভাবে রাত ১০টা পর্যন্ত দোকান খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ঈদ শেষে আবার দোকান বন্ধের সময় সন্ধ্যা ৭টা করা হয়। পরে গত ১১ জুন দোকান বন্ধের সময় বাড়িয়ে রাত ৯টা করা হয়। সর্বশেষ নির্দেশনায় রাত ৮টার মধ্যে দোকান বন্ধের কথা বলা হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বারবার দোকান বন্ধের সময় পরিবর্তনের কারণে বিক্রির সময়সূচি এবং কর্মীদের কাজের সময় নির্ধারণ করে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

সন্ধ্যার বিক্রিতে বড় ধাক্কা

যেসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার বড় অংশ সন্ধ্যার পর হয়ে থাকে, সর্বশেষ নির্দেশনায় তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে।

দেশের অন্যতম বড় জুতা প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার জানিয়েছে, তাদের দেশের মোট বিক্রির প্রায় ৬০ শতাংশ সাধারণত রাত ৮টার পর হয়।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফিরোজ মোহাম্মদ বলেন, সর্বশেষ দোকান বন্ধের সময় কমানোর পর দেশের বাজারে তাদের ব্যবসা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে। রাত ৮টায় দোকান বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আমাদের ব্যবসায় খুব বড় প্রভাব ফেলছে।

দেশে ২৪০টি আউটলেট পরিচালনা করা লোটো বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী জামিল ইসলাম বলেন, সর্বশেষ নির্দেশনা কার্যকর হওয়ার এক মাসের মধ্যেই তাদের বিক্রি প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। আমাদের মূল বিক্রি হয় সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৯টার মধ্যে।

বিক্রি কমলেও দোকানভাড়া ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় আগের মতোই রয়েছে বলে জানান তিনি।

আন্তর্জাতিক খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান মোস্তাফা মার্টও জানিয়েছে, সর্বশেষ নির্দেশনার পর তাদের ব্যবসায় বড় ধরনের পতন হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক (হিসাব ও অর্থ) বিএম সালেহ মুসা বলেন, ক্রেতারা সাধারণত সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টার মধ্যে কেনাকাটা করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। স্বাভাবিক বিক্রির তুলনায় গত এক মাসে আমাদের আয় প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে।

তিনি জানান, তাদের একটি শাখায় দৈনিক বিক্রি প্রায় ৩ লাখ টাকা থেকে কমে ৭০ হাজার টাকায় নেমে এসেছে। রাত ৮টার পরও যেসব ক্রেতা পণ্য কিনতে আসেন, বিক্রয়কর্মীদের তাদের ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের খুচরা বিক্রয় চেইন ডেইলি শপিংও জানিয়েছে, দোকান খোলা রাখার সময় কমানোর প্রভাব তাদের ব্যবসায় পড়েছে।

উত্তরার একটি আউটলেটের ব্যবস্থাপক হিরণ মাহমুদ বলেন, এখনো ক্রেতাদের রাত ৮টার মধ্যে কেনাকাটা শেষ করার অভ্যাস হয়নি। ফলে বিক্রি ও আয়, দুটোর ওপরই প্রভাব পড়েছে।

ট্রান্সকম ইলেকট্রনিকস লিমিটেডের উত্তরার গাউসুল আজম অ্যাভিনিউ শাখাতেও বিক্রি কমেছে। দোকান খোলা রাখার সময় কমানোর পর বিক্রি প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছেন শাখাটির অপারেশন প্রধান মো. শরীফ সরকার।

তিনি বলেন, আমাদের দৈনিক গড় বিক্রি যদি ৪ লাখ টাকা হয়, তাহলে ১০ শতাংশ কমার অর্থ ৪০ হাজার টাকা কম বিক্রি। এখন দিনে প্রায় ৩ লাখ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা বিক্রি হচ্ছে।

আগে ওই শাখাটি রাত ১০টার পরও খোলা থাকত।

খরচ বাড়ছেই

একদিকে দোকান খোলা রাখার সময় কমেছে, অন্যদিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও কমেছে। এর পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বেড়ে চলেছে।

জুতা ব্যবসায়ীরাও পেট্রোকেমিক্যালভিত্তিক কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাড়তি চাপের মধ্যে রয়েছেন। এর প্রভাব পড়েছে তাদের মুনাফাতেও।

অ্যাপেক্সের ফিরোজ মোহাম্মদ বলেন, আমাদের ব্যবসার একটা অংশ রপ্তানি, আরেকটা দেশের বাজারের জন্য। রপ্তানি ব্যবসা থেকে খুব বেশি মুনাফা থাকে না।

তিনি বলেন, কাঁচামালের দাম বাড়লেও এর পুরোটা ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দেয়নি অ্যাপেক্স। বাড়তি খরচের বড় একটি অংশ প্রতিষ্ঠান বহন করছে।

ছোট ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে বিক্রি কমে যাওয়া এবং নির্দিষ্ট খরচ একই থাকার বিষয়টি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।

বাংলাদেশ ফুটওয়্যার অ্যান্ড লেদার ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি ও ফাইভ-আর ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাসির খান বলেন, চাহিদা কমে যাওয়া, বাড়তি খরচ ও সামগ্রিক জ্বালানি সংকটের কারণে তারা প্রায় ৭০টি আউটলেট স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিয়েছেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারে ব্যবসা চালানো এখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

সহসাই স্বস্তির সম্ভাবনা নেই

সরকার বলছে, বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে রাত ৮টার মধ্যে দোকান বন্ধ রাখার নিয়ম শিথিল করার সম্ভাবনা নেই।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহাম্মদ আরিফ সাদেক বলেন, এখনো লোডশেডিং হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহও পর্যাপ্ত নয়। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বিষয়টি বিবেচনা করা সম্ভব নয়।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যার সময়ে বিদ্যুতের ঘাটতি এখনো উল্লেখযোগ্য।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর রাত ৯টায় বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৩৪৮ মেগাওয়াট। ওই সময়ে সরবরাহ ছিল ১৫ হাজার ৪৩৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৯১৩ মেগাওয়াট।

শীতকালে সাধারণত বিদ্যুতের ব্যবহার কমে যায়। সে সময় দোকান বন্ধের সময় নিয়ে বর্তমান বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না, জানতে চাইলে মুহাম্মদ আরিফ সাদেক বলেন, সেটা তখনকার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হবে।