দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে কোমলমতি শিশুদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন, ধর্ষণ এবং পরবর্তীতে প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে নির্মমভাবে হত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই ধরনের নৃশংসতা শিশুদের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে তীব্র ভীতি ও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে গত কয়েক মাসের পরিসংখ্যানে শতাধিক শিশু এই পাশবিকতার শিকার হয়েছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকজন জীবনের আলো হারিয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি লোমহর্ষক ঘটনা বিশ্লেষণ করে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা দেখিয়েছেন যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুরা পরিচিত জন, প্রতিবেশী কিংবা দূরসম্পর্কের আত্মীয়দের লালসার শিকার হচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সংকলিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বছরের প্রথম চার মাস ও মে মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত অন্তত ১১৮টি কন্যাশিশু ধর্ষণের নির্মম শিকার হয়েছে। এছাড়া আরও বেশ কিছু শিশুকে লাঞ্ছিত করার চেষ্টা চালানো হয়েছে। একই সময়ে শারীরিক নির্যাতনের পর অন্তত ১৭টি শিশুকে হত্যা করা হয়েছে, যার মধ্যে মে মাসের প্রথম বিশ দিনেই একাধিক মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে, পুলিশ সদর দপ্তরের নথিপত্র অনুযায়ী বছরের প্রথম চার মাসেই নারী ও শিশু নিপীড়নের অভিযোগে দেশজুড়ে প্রায় ছয় হাজার মামলা রুজু হয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা নির্দেশ করে। এছাড়া সরকারি সহায়তামূলক চাইল্ড হেল্পলাইনেও কয়েক হাজার যৌন হয়রানি ও নির্যাতন সংক্রান্ত কল এসেছে, যা গত বছরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি।
সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধ বিশ্লেষক এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের অপরাধ কেবল একক কোনো অপরাধ প্রবণতার ফল নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের সামাজিক অবক্ষয়ের একটি কুৎসিত বহিঃপ্রকাশ। সমাজে মাদকাসক্তির ব্যাপক বিস্তার, ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে বিকৃত বিষয়বস্তুর সহজলভ্যতা, পারিবারিক পর্যায়ে নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার অভাব এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষকদের মতে, শিশুরা সহজ ও দুর্বল লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় এবং নিজেদের সুরক্ষায় অক্ষম থাকার কারণে অপরাধীরা তাদের ওপর চড়াও হচ্ছে। এছাড়া আইনি জটিলতায় অপরাধের প্রমাণ যেন প্রকাশ না পায়, সেই আত্মরক্ষার কুৎসিত মানসিকতা থেকেই নির্যাতনের পর শিশুদের শ্বাসরোধে বা নৃশংসভাবে হত্যার পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে।
দেশের বিদ্যমান আইন কাঠামো শক্তিশালী হলেও এর যথাযথ প্রয়োগ ও মাঠপর্যায়ের তদন্ত প্রক্রিয়ার কিছু দুর্বলতাকেই মূল সংকট হিসেবে চিহ্নিত করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। সাবেক বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত প্রতিবেদনের কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যায় অথবা মামলার নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। আদালতে বিচারকের স্বল্পতা এবং মামলার জট এই দীর্ঘসূত্রতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। তবে আইনি ব্যবস্থার সাথে যুক্ত দায়িত্বশীল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করেছেন যে, শিশুদের ওপর ঘটে যাওয়া এই সব অপরাধের তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সুচারুভাবে সম্পন্ন করা হচ্ছে, যাতে আসামিরা সর্বোচ্চ শাস্তি পায় এবং এ ধরনের সংবেদনশীল মামলাগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে এবং নিজস্ব সংবিধানে শিশুদের সর্বোত্তম সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিতকরণের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে আরও কঠোর হওয়ার সময় এসেছে। ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা সামাজিক পরিবেশ—সব জায়গায় শিশুর জন্য একটি নিরাপদ বেষ্টনী গড়ে তোলা না গেলে কোনো রাষ্ট্রই টেকসইভাবে নিরাপদ হতে পারে না। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কেবল আইনি পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়, বরং রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারকে সাথে নিয়ে একটি সমন্বিত ও কঠোর সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।