দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ দুটি টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা ‘গোপন’ কনসেশন চুক্তি নিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। চুক্তির পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ এবং তা স্থগিতের দাবিতে সরকারের শীর্ষ দপ্তরগুলোতে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়সহ সরকারের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে ডাকযোগে এ বিষয়ে একটি চিঠি পাঠান দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ জন শিক্ষার্থী।
চিঠিতে ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা স্বাক্ষর করেন।
শিক্ষার্থীরা জানান, গত ১৭ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে লালদিয়ার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনা এবং একই দিনে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক মেডলগ এসএ-এর সঙ্গে পানগাঁও নৌ টার্মিনাল পরিচালনার জন্য অস্বাভাবিক দ্রুততায় গোপন কনসেশন চুক্তি করে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়া সত্ত্বেও এসব চুক্তির বিষয়বস্তু জনসমক্ষে প্রকাশ না করাকে সংবিধানের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনস্বার্থ রক্ষার নীতির পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেন তারা।
চিঠিতে আরও বলা হয়, এসব চুক্তিতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল অপারেটর নয়, বরং দীর্ঘ ৪৮ বছরের (৩+৩০+১৫ বছর) জন্য কনসেশনিয়ার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া চুক্তি সম্পাদন, দেশীয় প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের সুযোগ না রাখা এবং প্রতি কনটেইনারে ১৬৭ ডলারের পরিবর্তে মাত্র ২১ ডলার মাশুল নির্ধারণের ফলে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন। মাত্র ১১ থেকে ১৩ দিনের মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার প্রক্রিয়াকে তারা ‘অস্বাভাবিক’ বলে উল্লেখ করেন।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, দীর্ঘমেয়াদে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে গেলে অর্থনৈতিক স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। পাশাপাশি ফিলিস্তিনে গণহত্যায় সংশ্লিষ্ট ইসরায়েলে অস্ত্র পরিবহনে অভিযুক্ত আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এমন চুক্তি বাংলাদেশের সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতি ও নৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও তারা দাবি করেন।
এ অবস্থায় চিঠিতে তিন দফা দাবি তুলে ধরা হয়—
প্রথমত, নন-ডিসক্লোজার শর্তে করা কনসেশন চুক্তিগুলোর সম্পূর্ণ ও অবিকৃত তথ্য বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, চুক্তির আইনগত বৈধতা, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়নে অভিজ্ঞ ও নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি স্বাধীন উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা কমিটি গঠন করতে হবে।
তৃতীয়ত, পর্যালোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব চুক্তির আওতায় সব ধরনের কার্যক্রম স্থগিত রাখতে হবে।