শনিবার, 7 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

একটি জাতির আত্মহত্যা: গবেষণা না রাজনৈতিক প্রচার?

ব্রিটিশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাট গুডউইনের নতুন বই ‘সুইসাইড অফ এ নেশন’ প্রকাশের পর শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক—এটি কি একটি গবেষণাধর্মী কাজ, নাকি রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন? ড. গুডউইন তাঁর নতুন বই ‘সুইসাইড অফ এ নেশন: ইমিগ্রেশন, ইসলাম, আইডেন্টিটি’ স্ব-প্রকাশনার মাধ্যমে বাজারে এনেছেন, যা ইতোমধ্যে অ্যামাজনের বেস্টসেলার তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। যদিও স্ব-প্রকাশনা নিয়ে আপত্তি নেই, তবে গোরটন ও ডেন্টন আসনে রিফর্ম ইউকে-র পরাজিত প্রার্থীর এই কাজটিতে সম্পাদকীয় তত্ত্বাবধানের অভাব লক্ষণীয় বলে সমালোচকদের মত।

একটি জাতির আত্মহত্যা: গবেষণা না রাজনৈতিক প্রচার?

ব্রিটিশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাট গুডউইনের নতুন বই ‘সুইসাইড অফ এ নেশন’ প্রকাশের পর শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক—এটি কি একটি গবেষণাধর্মী কাজ, নাকি রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন? ড. গুডউইন তাঁর নতুন বই ‘সুইসাইড অফ এ নেশন: ইমিগ্রেশন, ইসলাম, আইডেন্টিটি’ স্ব-প্রকাশনার মাধ্যমে বাজারে এনেছেন, যা ইতোমধ্যে অ্যামাজনের বেস্টসেলার তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। যদিও স্ব-প্রকাশনা নিয়ে আপত্তি নেই, তবে গোরটন ও ডেন্টন আসনে রিফর্ম ইউকে-র পরাজিত প্রার্থীর এই কাজটিতে সম্পাদকীয় তত্ত্বাবধানের অভাব লক্ষণীয় বলে সমালোচকদের মত।

বইটি হাতে নিলেই প্রথম যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো এর ফন্টের অস্বস্তিকর উপস্থাপন। তবে আরও গভীরে গেলে দেখা যায় উৎসর্গপত্রে লেখা—“এই বইটি বিস্মৃত সংখ্যাগরিষ্ঠদের উৎসর্গীকৃত।”

এর আগে ২০১৮ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘ন্যাশনাল পপুলিজম: দ্য রিভোল্ট এগেইনস্ট লিবারেল ডেমোক্রেসি’ বইটি পশ্চিমা বিশ্বে জনতুষ্টিবাদের উত্থান নিয়ে নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের জন্য প্রশংসিত হয়েছিল। তখন গুডউইনের কাজ ছিল পরিমিত ও তথ্যনির্ভর।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে বলে অনেকে মনে করছেন। কেউ কেউ দাবি করছেন, তিনি নিজেই এখন সেই জাতীয়তাবাদী জনতুষ্টিবাদী ধারার অংশ হয়ে উঠেছেন, যেটি একসময় তিনি বিশ্লেষণ করতেন।

পরিকল্পনা ছিল, রিফর্ম পার্টির এমপি নির্বাচিত হওয়ার পরপরই বইটি প্রকাশ করা হবে। কিন্তু গত মাসে গোরটন ও ডেন্টন উপনির্বাচনে গ্রিন পার্টির প্রার্থী হান্না স্পেন্সারের কাছে পরাজিত হন গুডউইন। পরবর্তীতে তিনি গ্রিন পার্টির বিরুদ্ধে “সাম্প্রদায়িক রাজনীতি” এবং ইসলামপন্থীদের সঙ্গে জোটের অভিযোগ তোলেন। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তাকে ব্যঙ্গ করে “ম্যাট ব্যাডলস” বলেও আখ্যা দেওয়া হয়।

বর্তমানে তিনি জিবি নিউজের উপস্থাপক হিসেবে যুক্ত রয়েছেন এবং ব্রিটেনের ডানপন্থী রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত।

এআই ব্যবহার ও তথ্যগত বিতর্ক

বইটিতে পাণ্ডিত্যপূর্ণ কাঠামোর অভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুরো গ্রন্থে মাত্র ১২টি পাদটীকা রয়েছে, যার মধ্যে দুটি লিঙ্কে ChatGPT সোর্স কোড যুক্ত এবং পাঁচটি তাঁর নিজের সাবস্ট্যাক পোস্টের দিকে নির্দেশ করে।

গুডউইন দাবি করেছেন, তিনি কেবল তথ্য সংগ্রহের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেছেন। তবে লেখক অ্যান্ডি টুয়েলভস অভিযোগ করেন, বইটিতে সিসেরো, ফ্রিডরিখ হায়েক, স্যার রজার স্ক্রুটন ও নোয়া ওয়েবস্টারের নামে যে কিছু উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে, তার কয়েকটি যাচাইযোগ্য নয়।

উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, হায়েকের নামে উদ্ধৃত “সবচেয়ে বিপজ্জনক পরীক্ষা হলো সেগুলো যা সমগ্র সমাজের ওপর পরিচালিত হয়”—এমন কোনো বক্তব্যের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অভিবাসন ও পরিচয় নিয়ে মূল বক্তব্য

বইটির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অভিবাসন, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন এবং জাতিগত পরিচয়। গুডউইন দাবি করেন, “অভিজাতরা” একটি “জনসংখ্যার প্রতিস্থাপন” প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তাঁর মতে, ২১০০ সালের মধ্যে ব্রিটেনে মুসলিম জনগোষ্ঠীর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে তরুণদের মধ্যে শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশরা আর সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকবে না।

তিনি যুক্তি দেন, “একটি জাতির জাতিগত ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিই তাকে নোঙরের মতো এক জায়গায় ধরে রাখে।” একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন দেশের “স্বাতন্ত্র্য, সম্মিলিত স্মৃতি” ও ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

তবে সমালোচকরা বলছেন, তাঁর বিশ্লেষণে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বহুসাংস্কৃতিক ইতিহাস উপেক্ষিত হয়েছে। উল্লেখ করা হয়, একসময় ব্রিটেন নিজেকে বিশ্বের “সর্বশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদীয় [মুসলিম] শক্তি” হিসেবেও তুলে ধরেছিল।

তথ্যভিত্তিক অসঙ্গতি ও সমালোচনা

বইটির বিভিন্ন অংশে তথ্যগত অসঙ্গতির অভিযোগও উঠেছে। যেমন, ব্র্যাডফোর্ডের একটি শ্রেণিকক্ষে ভাষাগত বৈচিত্র্য নিয়ে তাঁর যে দাবি, তার কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া যায়নি। একইভাবে, কিছু ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক তথ্যও ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আরও একটি ক্ষেত্রে, মুসলিম এমপি ইকবাল মোহাম্মদের বক্তব্যকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে বলে সমালোচকরা দাবি করেছেন।

ইসলাম ও ব্রিটিশ সমাজ

গুডউইন ব্রিটেনে মুসলিম সম্প্রদায় সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিচ্ছিন্নতার চিত্র তুলে ধরেছেন। তবে বিভিন্ন সমীক্ষা ভিন্ন চিত্র দেখায়। ওপিনিয়াম পরিচালিত এক জরিপ অনুযায়ী, ৮৫ শতাংশ ব্রিটিশ মুসলিম গণতন্ত্রকে সর্বোত্তম ব্যবস্থা হিসেবে সমর্থন করেন, যা সাধারণ জনগণের তুলনায় বেশি। একইভাবে, আইনের সমান অধিকারের ক্ষেত্রেও তাদের সমর্থন বেশি।

জরিপে আরও দেখা যায়, মুসলিমদের একটি বড় অংশ যুক্তরাজ্যের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন এবং অমুসলিমদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখছেন।

১৯৬ পৃষ্ঠার বইটির শেষে গুডউইন লিখেছেন, “ব্রিটেন এখনও মৃত নয়, কিন্তু এটি মারাত্মক বিপদের মধ্যে রয়েছে। যদি একে আত্মহত্যার হাত থেকে বাঁচাতে হয়, তবে তা এখনই করতে হবে। আমাদের সভ্যতার শেষ পাতাগুলো এখনও লেখা হওয়ার প্রয়োজন নেই। এখানে নয়।”

তাঁর এই সতর্কবার্তা যেমন সমর্থন পেয়েছে, তেমনি সমালোচনাও তৈরি করেছে। অনেকের মতে, বইটি ব্রিটিশ ডানপন্থী রাজনীতির চিন্তাধারাকে সামনে আনে; আবার অন্যদের দৃষ্টিতে এটি আতঙ্ক সৃষ্টিকারী সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের প্রতিফলন।

সব মিলিয়ে, ‘সুইসাইড অফ এ নেশন’ শুধু একটি বই নয়—এটি ব্রিটেনের সমসাময়িক রাজনৈতিক বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে।

সূত্র: মিডিল ইস্ট আই