শুক্রবার, 6 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

এপস্টেইন ফাইলস: যৌন অপরাধের আড়ালে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর গোপন জাল

একজন কুখ্যাত যৌন অপরাধী হিসেবেই দীর্ঘদিন পরিচিত ছিলেন জেফরি এপস্টেইন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ্যে আসতে থাকা নথি ও তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে আরও গভীর, অস্বস্তিকর এক বাস্তবতার দিকে—যেখানে যৌন নিপীড়ন, বিপুল অর্থ, ক্ষমতার কেন্দ্র এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির অদৃশ্য সংযোগ একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

এপস্টেইন ফাইলস: যৌন অপরাধের আড়ালে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর গোপন জাল

একজন কুখ্যাত যৌন অপরাধী হিসেবেই দীর্ঘদিন পরিচিত ছিলেন জেফরি এপস্টেইন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ্যে আসতে থাকা নথি ও তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে আরও গভীর, অস্বস্তিকর এক বাস্তবতার দিকে—যেখানে যৌন নিপীড়ন, বিপুল অর্থ, ক্ষমতার কেন্দ্র এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির অদৃশ্য সংযোগ একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

সাম্প্রতিক প্রকাশিত দলিলপত্রে দেখা যায়, এপস্টেইন সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে কাতার আক্রমণের সম্ভাব্য পরিকল্পনার বিষয়ে আগাম ধারণা রাখতেন। একইভাবে ইউরো মুদ্রাকে ধসের হাত থেকে রক্ষায় নেওয়া উদ্ধার প্যাকেজ কার্যকর হওয়ার আগেই সে সম্পর্কেও তিনি অবগত ছিলেন। এমনকি ২০১৬ সালে তুরস্কে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের আগে দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকে রাশিয়া সতর্ক করেছিল—এমন তথ্যও তাঁর কাছে ছিল বলে ধারণা করা হয়।

২০১৯ সালে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করা এপস্টেইনের কথোপকথনের এসব খণ্ডিত তথ্য নতুন করে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনছে: আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে কি তাঁর কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগাযোগ ছিল?

যদিও সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত লাখ লাখ নথিতে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে তিনি নিয়মিত সিআইএ, এমআই৬ কিংবা মোসাদের দপ্তরে যাতায়াত করতেন, বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। সাবেক ও বর্তমান রাষ্ট্রদূত, বিশ্বনেতা ও ধনকুবেররাই বরং তাঁর কাছে যেতেন। এপস্টেইনের ক্যারিবীয় অঞ্চলের ব্যক্তিগত দ্বীপ, যেখানে অল্প বয়সী মেয়েদের পাচার ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে, সেখানেই গড়ে উঠেছিল এক অভিজাত, অদৃশ্য ও ক্ষমতাবান নেটওয়ার্ক।

এই নেটওয়ার্ক ছিল এমন এক স্তরে, যা অনেক সময় পেশাদার গোয়েন্দা কর্মকর্তা কিংবা বিশ্লেষকদের নাগালের বাইরেই অবস্থান করত। ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাকের সঙ্গে এপস্টেইনের ই–মেইল যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। একপর্যায়ে সেই সম্পর্ক এতটাই আলোচনায় আসে যে এপস্টেইন নিজেই বারাককে অনুরোধ করেন, যেন প্রকাশ্যে বলা হয় তিনি মোসাদের হয়ে কাজ করেন না।

তবে গোয়েন্দা ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক মহলের সঙ্গে এপস্টেইনের সংযোগ শুরু হয়েছিল আরও আগে। এর প্রথম সূত্র মেলে ডোনাল্ড বারের মাধ্যমে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা ওএসএসের সদস্য ছিলেন ডোনাল্ড বার। কোনো ডিগ্রি না থাকলেও তিনিই এপস্টেইনকে নিউইয়র্কের অভিজাত ডাল্টন স্কুলে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন।

ডোনাল্ড বার অবসরে অশ্লীল বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি লিখতেন। তাঁর ছেলে বিল বার তখন সিআইএতে কর্মরত ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে রিগ্যান ও জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে বিল বার যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল হন। ১৯৭৬ সালে ডাল্টন স্কুল ছাড়ার পর এপস্টেইন যোগ দেন বেয়ার স্টার্নস বিনিয়োগ ব্যাংকে।

তবে তাঁর প্রকৃত উত্থান ঘটে ১৯৮১ সালে যুক্তরাজ্য সফরের সময়। সেখানে তিনি পরিচিত হন ব্রিটিশ অস্ত্র ব্যবসায়ী ডগলাস লিসের সঙ্গে। লিসই তাঁকে ইসরায়েলি ব্যবসায়ী রবার্ট ম্যাক্সওয়েল এবং সৌদি অস্ত্র ব্যবসায়ী আদনান খাশোগির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। লিস ছিলেন সৌদি আরবের কাছে ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান বিক্রির ঐতিহাসিক চুক্তির মধ্যস্থতাকারী। নিউইয়র্ক টাইমসের ভাষায়, তিনি এপস্টেইনকে অভিজাত বৈঠকে নিয়ে যেতেন এবং ধীরে ধীরে একটি ক্ষমতাধর নেটওয়ার্কে যুক্ত করতেন।

এই সময়েই প্রকাশ্যে আসে ইরান কনট্রা কেলেঙ্কারি—যেখানে রিগ্যান প্রশাসন গোপনে ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে সেই অর্থ নিকারাগুয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সহায়তায় ব্যবহার করেছিল। পুরো লেনদেনে ইসরায়েল গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে।

এই পর্বে এপস্টেইনের সঙ্গে যুক্ত হন সাবেক মার্কিন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা জে স্ট্যানলি পটিঞ্জার। বাহ্যিকভাবে তাঁদের প্রতিষ্ঠান কর ফাঁকির কৌশল নিয়ে পরামর্শ দিত। তবে পরবর্তী সময়ে জানা যায়, ইরানে অস্ত্র সরবরাহসংক্রান্ত বিভিন্ন তৎপরতার সঙ্গেও তাঁরা জড়িত ছিলেন। এই সময় সৌদি ধনকুবের আদনান খাশোগি হয়ে ওঠেন এপস্টেইনের অন্যতম বড় ক্লায়েন্ট। এপস্টেইনের নিউইয়র্কের বাসভবন থেকে একটি ভুয়া অস্ট্রিয়ান পাসপোর্ট উদ্ধার করা হয়, যেখানে ঠিকানা হিসেবে সৌদি আরবের নাম লেখা ছিল।

মৃত্যুর এক বছর আগেও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এপস্টেইনের আগ্রহ স্পষ্ট ছিল। ২০১৮ সালের একটি ই–মেইলে তিনি ধারণা দেন, সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাসক সৌদি যুবরাজকে ফাঁদে ফেলা হয়েছিল।

এপস্টেইনের জীবনে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর প্রভাব আসে ম্যাক্সওয়েল পরিবারের মাধ্যমে। তাঁর সঙ্গিনী গিসলেন ম্যাক্সওয়েল ছিলেন রবার্ট ম্যাক্সওয়েলের মেয়ে। একসময়কার প্রভাবশালী এই সংবাদমাধ্যম মালিক ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা কর্মকর্তা ছিলেন এবং মোসাদ, এমআই৬ ও কেজিবির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল বলে বহু সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

১৯৯১ সালে ইরানে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ হওয়ার পর ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে নিজের ইয়ট থেকে পড়ে রবার্ট ম্যাক্সওয়েলের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। এর কিছুদিন আগেই গিসলেন ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে এপস্টেইনের পরিচয় ঘটে। একটি ই–মেইলে এপস্টেইন দাবি করেন, ম্যাক্সওয়েল মোসাদের হয়ে কাজ করতেন এবং অর্থ না দিলে গোপন তথ্য ফাঁসের হুমকি দিতেন।

এপস্টেইনের জীবনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিলেন মার্কিন ধনকুবের লেস ওয়েক্সনার। ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটসহ একাধিক বড় ব্র্যান্ডের মালিক এই ব্যবসায়ীর প্রায় পুরো সম্পদের নিয়ন্ত্রণই ছিল এপস্টেইনের হাতে। সংবাদমাধ্যমের তথ্যে জানা যায়, ইরান কনট্রা কেলেঙ্কারিতে ব্যবহৃত কিছু বিমান পরে ওয়েক্সনারের পোশাক পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হয়।

শিশু পাচারের দায়ে দণ্ডিত হওয়ার পরও এপস্টেইনের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ থেমে থাকেনি। তিনি ইসরায়েল ও মঙ্গোলিয়ার মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে কাজ করেন, এহুদ বারাকের হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক আয়োজন করেন এবং রাশিয়ার সঙ্গেও গোপন যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা চালান।

সূত্র: মিডিল ইস্ট আই